ড. সালেহউদ্দিন: গভর্নর হিসেবে হারিনি, উপদেষ্টা হিসেবেও জিতব

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্রান্তিকালে নিজের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন বর্তমান সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালীন তিনি যেমন ব্যর্থ হননি, বর্তমান দায়িত্ব পালনেও তিনি সফল হবেন।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ব্যাংকিং অ্যালমানাক’ বা ব্যাংকিং বর্ষপুস্তকের সপ্তম সংস্করণের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে নিজের অতীত সাফল্যকে বর্তমানের প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, গভর্নর হিসেবে আমি ব্যর্থ হইনি, উপদেষ্টা হিসেবেও ব্যর্থ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে অসম্ভব নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক নীতি নির্ধারণ এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

দেশের সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির যে চাপ রয়েছে, তা নিরসনে ব্যবসায়ী সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ দাবি করেছেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি উল্লেখ করেন, কেবল নীতিমালার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কেবল সরকারের একার কাজ নয়, ব্যবসায়ী সমাজের সহযোগিতা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার পরিচয় দিতে হবে।

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন অনেকটা স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে ঋণ গ্রহীতাদের জন্য এখনই কোনো সুখবর নেই। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো এই মুহূর্তে সহজ নয়। অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার্থেই এমন কঠোর সিদ্ধান্ত বজায় রাখতে হচ্ছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যাংকাররা বিগত কয়েক বছরের ব্যাংকিং খাতের বেহাল দশার ব্যবচ্ছেদ করেন। তাদের মতে, বিগত সময়ে কোনো ধরনের বাছ বিচার ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স বা অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই লাইসেন্স রাজনীতিই মূলত ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা এবং খেলাপি ঋণের পাহাড় তৈরির প্রধান কারণ। ব্যাংকাররা মনে করেন, দক্ষ তদারকি এবং স্বচ্ছতার অভাবে অনেক ব্যাংক এখন মৃতপ্রায়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। জিল্লুর রহমান বলেন, ভঙ্গুর দশা থেকে আমাদের অর্থনীতি কিছুটা উন্নতির দিকে এগোলেও একে কোনোভাবেই সন্তোষজনক বলার সুযোগ নেই। সংস্কারের গতি আরও বাড়াতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। তার মতে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বস্তি না আসা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনের মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের চেয়ে দ্রুত ফলাফল অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগী হতে চাইছে। তবে ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংকট এবং ব্যবসায়ীদের জোট বা সিন্ডিকেট ভাঙা তার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে সুদহার না কমিয়ে কীভাবে বিনিয়োগ সচল রাখা যায়, সেটিই হবে দেখার বিষয়।

পরিশেষে, ব্যাংকিং বর্ষপুস্তকের মতো প্রকাশনাগুলো দেশের আর্থিক খাতের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে অনুষ্ঠানে বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এসএইচ