আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে জেফরি এপস্টেইন কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি অতলান্তিক নৈতিক সংকটের স্মারক। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে নির্জন এক দ্বীপকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কেলেঙ্কারি বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল গেটস, ইলন মাস্কের মতো বিশ্বখ্যাত নামগুলোকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে। ভারতের প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক প্রতাপ ভানু মেহতার একটি গভীর বিশ্লেষণ ধর্মী লেখায় ফুটে উঠেছে কীভাবে এই দ্বীপটি আধুনিক অভিজাত শ্রেণির যৌন লালসা, আর্থিক অপরাধ এবং ক্ষমতার দম্ভের নগ্ন প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছিল।
ইতিহাসজুড়ে ‘দ্বীপ’ বা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ভূভাগকে এক ধরনের ফ্যান্টাসি বা কল্পনার জায়গা হিসেবে দেখা হয়েছে। আলোকিত যুগের পর থেকে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, মূল সমাজের কঠোর নৈতিক আইন এবং সামাজিক নিষেধাজ্ঞাগুলো সাময়িকভাবে তুলে রাখা যায় এমন কোনো জায়গায়, যা লোকচক্ষুর আড়ালে।
প্রতাপ ভানু মেহতার মতে, এই ‘অফশোরিং’ ধারণাটি কেবল আর্থিক অপরাধ বা কর ফাঁকির ক্ষেত্রে নয়, বরং যৌন লালসা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষমতাবানরা ভেবেছিলেন, সমুদ্রের ওপারের নির্জন দ্বীপে তারা যা খুশি তা-ই করতে পারেন, আর এতে তাদের মূল সামাজিক ইমেজের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু এই ধারণাটিই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।
আমরা যখন ‘অফশোর ব্যাংকিং’ বা মানি লন্ডারিংয়ের কথা বলি, তখন মনে করা হয় অপরাধটি মূল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে ঘটছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অফশোর ব্যবস্থাগুলো মূল কেন্দ্রের অপরাধকে আরও শক্তিশালী এবং সংহত করে।
একইভাবে, এপস্টেইনের দ্বীপে যা ঘটেছে, তা কেবল গুটিকয়েক মানুষের ব্যক্তিগত বিকৃতি ছিল না। এটি ছিল আধুনিকতার এক অন্ধকার অধ্যায়, যেখানে মানুষের দেহকে পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা ভেবেছিলেন গোপন এই অপরাধ তাদের মূল ক্ষমতাকে স্পর্শ করবে না, কিন্তু সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে—এই পচন আসলে কেন্দ্রের ভেতরেই ছড়িয়ে ছিল।
এপস্টেইন ফাইলের পাতায় পাতায় যে মানুষগুলোর নাম উঠে এসেছে, তারা কোনো স্বাধীনচেতা বিদ্রোহী বা সামাজিক প্রথা ভাঙার নায়ক ছিলেন না। বরং তারা ছিলেন এক অদ্ভুত মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগা একদল মানুষ। তাদের একদিকে আছে অসীম ক্ষমতা আর দায়মুক্তির আত্মবিশ্বাস (আইন আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না), অন্যদিকে রয়েছে চরম মানসিক অপরিণত আচরণ।
মেহতা একে বর্ণনা করেছেন এমন এক সমাজ হিসেবে, যেখানে ‘ক্ষমতা আছে কিন্তু সংযম নেই, প্রভাব আছে কিন্তু নৈতিকতা নেই।’ মানুষকে এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দেহকে কেনাবেচার বস্তু হিসেবে দেখার এই মানসিকতা প্রমাণ করে যে, বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই অভিজাত শ্রেণি মানসিকভাবে কতটা ভঙ্গুর।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে ডেমোক্রেটিক এবং রিপাবলিকান—উভয় দলের শীর্ষ নেতাদের সম্পৃক্ততা একে এক জটিল মোড় দিয়েছে। যখন সব পক্ষই কাদা মাখা থাকে, তখন প্রকৃত বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এপস্টেইন ফাইলগুলো এখন আমেরিকার অভিজাত শ্রেণির এক নির্মম ‘এক্স-রে’ রিপোর্ট।
এই কেলেঙ্কারি কেবল যৌন অপরাধের বিচার নয়, বরং এটি বিশ্বকে একটি বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা যাদের হাতে পৃথিবীর ভাগ্য তুলে দিয়েছি, তারা যখন অসীম ক্ষমতার নেশায় লজ্জাকে বিসর্জন দেয়, তখন বিশ্ব নিরাপদ থাকে না।
একজন মানুষ যখন আইনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার দুঃসাহস দেখায় এবং নির্জন দ্বীপে পৈশাচিক আনন্দে মেতে ওঠে, তখন তার নেওয়া রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও যে জনস্বার্থবিরোধী হবে—তা বলাই বাহুল্য।
এপস্টেইনের দ্বীপ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ক্ষমতার সেই কুৎসিত চেহারার বহিঃপ্রকাশ, যা নৈতিকতাকে সমুদ্রের ওপারে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। প্রতাপ ভানু মেহতার এই বিশ্লেষণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা যখন নৈতিকতা ও সংযম হারিয়ে ফেলে, তখন তা কেবল ব্যক্তির পতন ঘটায় না, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের আত্মাকে কলুষিত করে।











