গভর্নর: সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অগ্রযাত্রায় বিঘ্ন ঘটানোর অপচেষ্টা চলছে

ফাইল ছবি

দেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান অস্থিরতা এবং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি অভিযোগ করেছেন, একটি বিশেষ মহল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে গভর্নর ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত এবং গ্রাহকদের সচেতনতা নিয়ে কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা প্রদান করেন।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করছে, ঠিক তখনই একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কার্যক্রম ব্যাহত করতে চাইছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করাই এই মহলের মূল উদ্দেশ্য।

তিনি আমানতকারীদের এসব অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং আশ্বাস দেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রাহকদের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক ঘোষণা দেন গভর্নর। তিনি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

পর্যায়ক্রমিক অর্থ প্রদান: সব আমানতকারীকে ধাপে ধাপে তাদের গচ্ছিত অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। বর্তমান ব্যাংকটি এমন অবস্থানে পৌঁছেছে যে, এফডিআর (FDR) এবং ডিপিএস (DPS) সহ সব ধরনের হিসাবধারীরা এখন সীমিত আকারে হলেও টাকা তুলতে পারছেন।

অনলাইন ব্যাংকিং: সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে খুব দ্রুতই ডিজিটাল বা অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে শুরু হবে। এতে লেনদেন আরও স্বচ্ছ ও সহজতর হবে।

ঋণ সুবিধা: যাদের আমানত আটকে আছে বা জরুরি অর্থের প্রয়োজন, তারা তাদের আমানতের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

গভর্নর তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত সাহসী ও সোজাসাপ্টা কিছু মন্তব্য করেন। বিশেষ করে পাঁচটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে লুটপাটের ঘটনা জানা থাকা সত্ত্বেও যারা সেখানে টাকা জমা রেখেছেন, তাদের সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি বলেন, লুটের ঘটনা সবার জানা ছিল। তারপরেও শুধুমাত্র অধিক মুনাফা বা সুদের লোভে অনেক আমানতকারী সেখানে টাকা রেখেছেন। ঝুঁকির কথা জেনেও যারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এই সংকটে তাদেরও কিছু দায়ভার রয়েছে।

তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য গ্রাহকদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কেবল উচ্চ মুনাফার আশায় দুর্বল ব্যাংকে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে নেতিবাচক অপপ্রচার ও তারল্য সংকটে পড়েছে, যার মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনলাইন কার্যক্রম চালু করে পর্যায়ক্রমে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা নিচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকে লুটপাটের ইতিহাস ও আস্থার সংকট মোকাবিলায় কঠোর তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং আমানত বীমার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অপরদিকে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ও সচেতনতার অভাব দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সঠিক তথ্য প্রদান করছে। পাশাপাশি ঋণ কার্যক্রমে খেলাপি ঋণের আধিক্য কমাতে আমানতের বিপরীতে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করা হয়েছে।

গভর্নর স্পষ্ট করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আর কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দেবে না। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তার ফলে দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারীরা লাভবান হবেন। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়।

ড. আহসান এইচ মনসুরের এই সংবাদ সম্মেলন ব্যাংকিং খাতে চলমান অস্বস্তি নিরসনে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য অনলাইন সেবা ও পর্যায়ক্রমে টাকা ফেরতের ঘোষণা কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে। তবে একই সঙ্গে গ্রাহকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে তাঁর কঠোর মন্তব্য ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক হতে বাধ্য করবে।