ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে একটি স্বতন্ত্র স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। ‘সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর আন্দোলন’-এর ব্যানারে আজ বুধবার বেলা ১টা থেকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেছেন আন্দোলনকারীরা। শিক্ষার্থীদের সাফ কথা—আগামীকাল বৃহস্পতিবারের (১৫ জানুয়ারি) মধ্যে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’র চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। অন্যথায় রাজপথ ছাড়বেন না তারা।
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আজ বেলা ১১টার পর থেকেই ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। সেখান থেকে একটি বিশাল মিছিল নীলক্ষেত হয়ে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে গিয়ে অবস্থান নেয়। দুপুর ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়কের চারপাশ বন্ধ করে দিলে মিরপুর রোড, এলিফ্যান্ট রোড এবং কলাবাগানমুখী সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
অবরোধস্থলে শিক্ষার্থীরা ‘রাষ্ট্র তোমার সময় শেষ, জারি করো অধ্যাদেশ’, ‘এক দফা এক দাবি, সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়’—এমন সব স্লোগান দিয়ে রাজপথ মুখরিত করে তুলছেন। দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ যাত্রী ও অফিসগামীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে দেখা গেছে। অনেকে বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবিটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। তারা চাচ্ছেন, আগামীকাল ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন-২০২৫’-এর হালনাগাদ খসড়া অনুমোদন করা হোক এবং একই দিনে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারি করা হোক।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া আইন প্রকাশিত হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা থমকে আছে। তারা মনে করছেন, বারংবার আশ্বাসের পরও সরকার অধ্যাদেশ জারিতে কালক্ষেপণ করছে।
এর আগে গত ৭ ও ৮ ডিসেম্বর শিক্ষা ভবন অভিমুখে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। সেই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি অনুযায়ী, সেই সভায় মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করেছিল যে ডিসেম্বরের মধ্যে সব আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই অধ্যাদেশ জারি করা হবে।
আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বলেন, জানুয়ারির অর্ধেক মাস পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এখন পর্যন্ত অধ্যাদেশের কোনো দেখা নেই। আমরা জানতে পেরেছি আগামীকাল উপদেষ্টাদের বৈঠক আছে। আমরা চাই এই বৈঠকেই আমাদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটুক।
উল্লেখ্য, গতকাল মঙ্গলবারই ‘সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর আন্দোলন’-এর পক্ষ থেকে রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সায়েন্স ল্যাব ছাড়াও টেকনিক্যাল মোড় এবং তাঁতীবাজার মোড়েও আন্দোলনের কর্মসূচি রয়েছে। এর মাধ্যমে রাজধানীর পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন শিক্ষার্থীরা।
সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাখা হবে নাকি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করা হবে—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিতর্ক চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কলসালটেশন সভা করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে খসড়াটি হালনাগাদ করেছে। এখন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক আদেশের অপেক্ষা।
সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আন্দোলনের কারণে ওই এলাকার দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলো যাতে যাতায়াত করতে পারে, সেদিকে শিক্ষার্থীদের বিশেষ নজর দিতে দেখা গেছে।
আগামীকাল ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হতে পারে যদি সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে অধ্যাদেশ জারি করে। অন্যথায়, শিক্ষার্থীদের দেওয়া আলটিমেটাম অনুযায়ী ঢাকা শহর অনির্দিষ্টকালের জন্য অচল হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘব এবং উচ্চশিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে সরকার দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
পুরো রাজধানীর চোখ এখন সায়েন্স ল্যাবের আন্দোলন আর আগামীকালকের উপদেষ্টা পরিষদের সভার দিকে।
এসএইচ











