চলতি বছরের আগস্টে দেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে আগের মাস জুলাইয়ের তুলনায় লেনদেন কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। গত বছরের একই মাসে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, চলতি বছরের জুলাইয়ে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহারসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্ডের ব্যবহারও বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ইস্যু করা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সম্মিলিত সংখ্যা বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। একই সময়ে এসব কার্ডে লেনদেনের মোট পরিমাণ বেড়েছে ১০৩ শতাংশ।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪২ লাখ, ক্রেডিট কার্ড ১৭ লাখ ৬২ হাজার এবং প্রিপেইড কার্ড ১০ লাখ ২৬ হাজার। সব মিলিয়ে তখন কার্ডের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ।
২০২৬ সালের আগস্টে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ১ লাখে। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা হয়েছে ২৮ লাখ ৫ হাজার এবং প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ৯২ লাখ ৭০ হাজার। এতে তিন ধরনের কার্ডের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ কোটি ২৯ লাখ।
কার্ডের ধরন অনুযায়ী, পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা—৮০৩ শতাংশ। এ সময়ে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ। তবে মোট সংখ্যার হিসাবে এখনো সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ডেবিট কার্ড।
এদিকে, কার্ডে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এসব কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছিল ২৪ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭৭০ কোটি টাকায়।
আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এ খাতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা, যা মোট লেনদেনের ৪৮ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এর আগের মাস জুলাইয়ে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। ওই মাসে মোট লেনদেনে এ খাতের অংশ ছিল ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটা, ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন প্রচারমূলক অফার এবং ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কার্ডের ব্যবহার বাড়ার সম্ভাব্য কারণ। তবে পৃথক পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব কারণ নিশ্চিত করা হয়নি বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেনের ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়। নগদ অর্থ উত্তোলনের অংশ ছিল ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আর তহবিল স্থানান্তরে ব্যয় হয়েছে মোট লেনদেনের শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ।
আগস্টে বাংলাদেশে ইস্যু করা ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে প্রায় ৯৮৭ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন বাংলাদেশিরা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫০৫ কোটি, ডেবিট কার্ডে ৪২২ কোটি এবং প্রিপেইড কার্ডে ৬০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ জুলাইয়ের তুলনায় কমেছে। জুলাইয়ে এ ধরনের কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ৫২৬ কোটি টাকা, যা আগস্টে নেমে এসেছে ৫০৫ কোটি টাকায়। একই সময়ে লেনদেনের সংখ্যা ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৬ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার ১৫০টিতে।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। মোট ব্যয়ের ৩০ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে এ খাতে। এরপর খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, পরিবহন খাতে ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং ওষুধ ও ফার্মেসিতে ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে, বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে মোট ব্যয়ের ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে। এরপর থাইল্যান্ডে ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ভারতে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
অন্যদিকে, বিদেশে বাংলাদেশিদের ডেবিট কার্ডে লেনদেন জুলাইয়ের ৪০১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগস্টে ৪২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। সরকারি সেবায় ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ, ব্যবসায়িক সেবায় ১৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং নগদ অর্থ উত্তোলনে ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
বিদেশে ডেবিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে যুক্তরাজ্যে, যা মোট ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং ভারতে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
প্রিপেইড কার্ডেও বিদেশে লেনদেন বেড়েছে। জুলাইয়ে এ ধরনের কার্ডে ৫৮ কোটি টাকা ব্যয় হলেও আগস্টে তা বেড়ে ৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রিপেইড কার্ডে সবচেয়ে বেশি ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে সরকারি সেবায়। এরপর নগদ অর্থ উত্তোলনে ১৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং ব্যবসায়িক সেবায় ১৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে, বিদেশে প্রিপেইড কার্ডে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে ভারতে, যা মোট ব্যয়ের ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ, সৌদি আরবে ১০ দশমিক ২১ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
আগস্টে বিদেশে ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে ২৪৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ২৩৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক মাসে লেনদেন বেড়েছে ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এরপর নগদ অর্থ উত্তোলনে ২৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ, পরিবহন খাতে ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং পোশাকের দোকানে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে, বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ইস্যু করা কার্ডে। মোট লেনদেনের ২১ দশমিক ২৯ শতাংশ এসেছে এসব কার্ড থেকে। এরপর যুক্তরাজ্যে ইস্যু করা কার্ডের অংশ ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ভারতে ইস্যু করা কার্ডের অংশ ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, আগস্টে বাংলাদেশে ইস্যু করা ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে ব্যয়ের পরিমাণ বিদেশি কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে লেনদেনের তুলনায় প্রায় চার গুণ ছিল।
আগস্ট শেষে দেশের ৪৭টি তফসিলি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের সম্মিলিত অনুমোদিত ঋণসীমা ছিল ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ডধারীদের বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভোক্তাদের লেনদেনে নগদ অর্থের প্রাধান্য থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগদ লেনদেনের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে লেনদেন বাড়াতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে।
তবে নগদবিহীন লেনদেনের প্রসারে এখনো বেশ কিছু বাধা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থনির্ভর অর্থনীতি, ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব, লেনদেনের খরচ এবং স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, কার্ডের ব্যবহার বাড়লে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার হওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণেও সহায়তা মিলতে পারে। তবে এ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জালিয়াতি প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করা, গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।











