রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ খণ্ড-বিখণ্ড করার চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আগামী ৭ জুন (রোববার) ঘোষণা করা হবে। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ- উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আজ বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার এই দিন ধার্য করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের এজলাসে আসেন বিচারক মাসরুর সালেকীন। এরপরই রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু তাঁর আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে বক্তব্য পেশ করে।
অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাঁদের মক্কেলদের পক্ষে সাফাই গেয়ে যুক্তি দেন। বেলা ১টা ৩৬ মিনিটে উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হলে আদালত রায় ঘোষণার জন্য আগামী ৭ জুন দিন চূড়ান্ত করেন।
আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল ৯টার দিকেই কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে আসা হয়। পরে বেলা ১১টা ২৪ মিনিটে তাঁকে কড়া পুলিশি পাহারায় ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।
মামলার অপর আসামি ও সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে আদালতে হাজির করা হয়। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) পিটার গোমেজ সংবাদমাধ্যমকে জানান, আসামি স্বপ্না আক্তার গুরুতর অসুস্থ থাকায় তাঁকে কারাগারের হাসপাতাল থেকে সরাসরি আদালতে নিয়ে আসা হয়েছিল।
মামলার বিবরণ ও পুলিশি নথিপত্র থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে পল্লবীর একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে ওই আট বছরের শিশুটির খণ্ডিত ও বীভৎস মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ও মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা বাসার শৌচাগারের (বাথরুম) জানালার গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘর থেকে তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে প্রযুক্তির সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই নৃশংস ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শিশুটির বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা ও নারী নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।
সাধারণত দেশের ফৌজদারি মামলাগুলোর বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগলেও, এই শিশু হত্যার ঘটনাটিতে বিচার প্রক্রিয়া চলেছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর গত ১ জুন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন। এর মাধ্যমে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
অভিযোগ গঠনের পরদিনই অর্থাৎ ২ জুন আদালত এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন। সেদিন নিহত শিশুটির বাবা-মা, প্রতিবেশী এবং তদন্ত কর্মকর্তাসহ সর্বমোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়ে তাঁদের সাক্ষ্য প্রদান করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী তাঁদেরকে জেরা করেন।
আজ ৪ জুন মাত্র কয়েক ঘণ্টার শুনানিতে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ তাঁদের সমাপনী যুক্তিতর্ক শেষ করেন।
এই মামলার সবচেয়ে আলোচিত ও নাটকীয় মোড় আসে মূল আসামি সোহেল রানার জবানবন্দি ও আদালতের কাঠগড়ায় দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে।
গ্রেফতারের পর গত ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন সোহেল রানা। তখন তিনি পুলিশের কাছে এবং আদালতে নিজের মুখে স্বীকার করেছিলেন যে, তিনিই শিশুটিকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন।
তবে বিচার শুরু হতেই নিজের আগের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যান সোহেল রানা। গত ১ জুন আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে এই অপরাধ করেননি, বরং ‘ডলার’ নামের এক ব্যক্তি শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। আদালত যখন তাঁর কাছে ডলারের পরিচয় জানতে চান, তখন সোহেল রানা বলেন- ডলারের বাড়ি মিরপুরে, সে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং অনেক টাকা-পয়সার মালিক। নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে সোহেল রানা আদালতকে বলেছিলেন, আমি মারিনি। আমি ধর্ষণও করিনি। আমার স্ত্রীও নির্দোষ।
কিন্তু এর পরদিনই অর্থাৎ ২ জুন আদালতে দাঁড়িয়ে আবার নতুন কথা বলেন সোহেল। এবার তিনি আংশিক অপরাধ স্বীকার করে বলেন, আমার সাথে যে ছিল ডলার, তারে আপনারা ধরেন। আমি দোষ করি নাই তা না, আমিও দোষ করেছি, ডলারও দোষ করেছে।অর্থাৎ, প্রথমে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করলেও পরে তিনি স্বীকার করেন যে তিনি ও ডলার—উভয়েই এই জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলেন।
আসামি সোহেল রানা বারবার ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বের কথা জানালেও রাষ্ট্রপক্ষ এবং স্বয়ং আসামিপক্ষের আইনজীবী একে সাজানো গল্প বলে মনে করছেন।
আসামিপক্ষে সরকার নিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, আসামিরা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে আইনি পরামর্শের সময় কখনোই ‘ডলার’ নামের কারও কোনো অস্তিত্বের কথা বলেননি। এমনকি পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনেও (চার্জশিট) ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা বা নামের উল্লেখ নেই।
আইনজীবীদের ধারণা, মামলার নিশ্চিত ও কঠোর শাস্তি থেকে বাঁচতে এবং আদালতকে বিভ্রান্ত করে সময়ক্ষেপণ করার লক্ষ্যেই শেষ মুহূর্তে আসামি সোহেল রানা এই কাল্পনিক ‘ডলার’ চরিত্রটি খাড়া করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা, ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দিতে আসামির অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি রাষ্ট্রপক্ষের।
আগামী ৭ জুন ট্রাইব্যুনালের রায়ের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে এই পৈশাচিক শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারটি কতটা দ্রুত এবং সঠিক বিচার পায়। পুরো পল্লীবী এলাকা তথা দেশবাসী এখন এই রায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন।











