আবুধাবি বিমানবন্দরে ৬০টি ফ্লাইট বাতিল

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে চলমান অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম প্রধান বিমানবন্দর, আবুধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।

সোমবার সকাল থেকেই বিমানবন্দরে চরম বিশৃঙ্খলা নেমে এসেছে। ৬০টি ফ্লাইট বাতিল এবং ৪১টি ফ্লাইটের দীর্ঘ বিলম্বের কারণে হাজার হাজার যাত্রী বর্তমানে বিমানবন্দরে আটকা পড়ে আছেন। বিশেষ করে ইন্ডিগো এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের যাত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাহাকার দেখা গেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ট্রানজিট হাব। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আকাশপথ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কারণে আজ বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আজ দিনের শুরু থেকেই একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে। এর ফলে কেবল ভ্রমণ পরিকল্পনা নষ্ট হয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন শিল্পেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে ভারতীয় সাশ্রয়ী বিমান সংস্থা ইন্ডিগো। ইন্ডিগো তাদের মোট ফ্লাইটের প্রায় ৮৬ শতাংশ বা ২৬টি ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। মাত্র একটি ফ্লাইট দেরিতে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়াগামী যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় ক্যারিয়ার ইতিহাদ এয়ারওয়েজের ১০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং ২৮টি ফ্লাইট দীর্ঘ বিলম্বের শিকার হয়েছে।

যেহেতু ইতিহাদ আবুধাবিকে তাদের বৈশ্বিক হাব হিসেবে ব্যবহার করে, তাই এর প্রভাবে লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক, সব রুটের যাত্রীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কাতার এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ার, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এবং এয়ার চায়নাও এই অপারেশনাল সংকটের কবলে পড়েছে। এয়ার অ্যারাবিয়া আবুধাবি এবং ইজিপ্ট এয়ারের ফ্লাইটেও বিলম্ব দেখা গেছে, তবে ইতিহাদের তুলনায় তাদের প্রভাব ছিল কিছুটা কম।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে পর্যটনের পিক সিজন বা মূল মৌসুম চলছে। আবুধাবির বিখ্যাত লুভর মিউজিয়াম, শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মস্ক এবং কর্নিশের মতো দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্য হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক এখন আরব আমিরাতে অবস্থান করছেন।

বিমানবন্দরের এই অস্থিতিশীলতা বিদেশি পর্যটকদের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। ফ্লাইট বাতিলের ফলে হোটেল বুকিং বাতিল, ট্যুর অপারেটরদের লোকসান এবং স্থানীয় খুচরা ব্যবসা বাণিজ্যে বড় ধরনের মন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আবুধাবি সরকার পর্যটন খাতের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

বিমানবন্দরের টার্মিনালগুলোতে এখন কেবলই অনিশ্চয়তার দীর্ঘ সারি। হাজারো যাত্রী ট্রানজিট পয়েন্টে আটকা পড়ে আছেন, যাদের কাছে পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার কোনো নিশ্চিত বার্তা নেই। কেউ কেউ দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন সামান্য তথ্যের আশায়। বিশেষ করে যারা ব্যবসায়িক কাজে বা জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণে ছিলেন, তাদের ক্ষয়ক্ষতি অপূরণীয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বিমান চলাচলের অবকাঠামোর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আকাশপথের স্থিতিশীলতা না ফিরলে ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয় আরও বাড়তে পারে।

আমিরাত সরকার সব যাত্রীকে বিমানবন্দরে আসার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের অ্যাপ বা ওয়েবসাইট থেকে ফ্লাইটের বর্তমান অবস্থা যাচাই করার জন্য জরুরি অনুরোধ জানিয়েছে। অনেক যাত্রীকে বিকল্প রুট বা পরিবহনের অন্য মাধ্যম খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আঞ্চলিক বিমান চলাচল অবকাঠামোকে আরও সহনশীল এবং নমনীয় করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৬ সালের এই বিমান চলাচল বিপর্যয় কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। আবুধাবি বিমানবন্দর যখন বিশ্বের সংযোগস্থল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এই অপারেশনাল ধাক্কা আমিরাতের পর্যটন এবং আকাশপথের স্থিতিশীলতাকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে অপারেশনাল ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই।

এসএইচ