অর্থ উপদেষ্টা: জ্বালানি সংকট নিরসন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকারের বড় উদ্যোগ

দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষ করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি গ্যাসের সংকট সমাধান এবং নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে তিনি গণমাধ্যমের সামনে সরকারের এসব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতকে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেন অর্থ উপদেষ্টা। বিশেষ করে ইরান ও ভেনিজুয়েলার বর্তমান অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের টালমাটাল পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, সরকার কেবল সাময়িক সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে মনোনিবেশ করছে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি মোকাবিলায় আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে গৃহস্থালি ও শিল্পে এলপিজি গ্যাসের যে সমস্যা চলছে, তা দ্রুততম সময়ে সমাধানের জন্য কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক উৎসগুলো থেকে জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে উপদেষ্টার বক্তব্যে আশার আলো দেখা গেছে। তিনি জানান, বর্তমানে পে কমিশন বা বেতন কাঠামো কমিশন নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। কমিশন তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরপরই এ বিষয়ে সরকার বিস্তারিত ঘোষণা দেবে।

বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি’র অর্থায়নে দেশজুড়ে ৬০ হাজার চালককে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই বিশাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সফল করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটি সরাসরি কাজ করবে। সরকারের লক্ষ্য হলো, সাধারণ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালক পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি করা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্যে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর জন্য শরীরে পরিধানযোগ্য ক্যামেরা বা বডি ক্যামেরা কেনার বিষয়েও আলোচনা হয়।

অর্থ উপদেষ্টা জানান, বডি ক্যামেরা কেনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। তারা সেই বাজেট থেকেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয় করবে এবং খুব শীঘ্রই মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের বডি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে।

সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সংগ্রহের বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। উপদেষ্টা জানান, রমজান ও পরবর্তী মাসগুলোতে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থ উপদেষ্টার আজকের এই বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট যে, সরকার বহুমুখী সংকটের মধ্যেও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সুনির্দিষ্ট খাতগুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে।

একদিকে যেমন জ্বালানি ও বেতন কাঠামোর মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ার কাজও এগিয়ে যাচ্ছে। ৬০ হাজার চালকের প্রশিক্ষণের সিদ্ধান্তটি দেশের বেকার সমস্যা নিরসনে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

এসএইচ