সততার মুখোশে ভয়ংকর খালেক

যে কোন সভা কিংবা বক্তৃতায় অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঝড় তুলতেন। নামাজের পর মসজিদে করতেন কোরআন হাদিসের আলোচনা। গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে আছে তার সততার গল্প। তিনি একজন নিপাট ধর্মভীরু দরবেশ ভদ্রলোক- সবার ভাবনাও ছিল এমন। কিন্তু প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। মুখোশের আড়ালে ভয়ংকর তিনি। বিতাড়িত আওয়ামী লীগের প্রভাবে দীর্ঘ সময় খুলে বসে ছিলেন ক্ষমতার অপব্যবহারের দরবার। আইন লঙ্ঘন, অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট আর উগ্রতার কালো অধ্যায় গড়েছেন কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। যার কথা বলছি, তিনি হলেন বীমা খাতের আলোচিত-সমালোচিত সিইও মো. আব্দুল খালেক মিয়া।

খালেকের নিয়ন্ত্রণে ছিল দেশের দুইটি সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান সোনার বাংলা ও ইসলামী ইস্যুরেন্স। তবে এবার চ্যাপ্টার ক্লোজ হতে যাচ্ছে, সততার মুখোশে লুকিয়ে থাকা খালেক মিয়ার। অপরাধে জড়িয়ে সোনার বাংলার পর ইসলামী ইস্যুরেন্স থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। এছাড়াও ছাত্র হত্যা মামলা ও অর্থ কেলেঙ্কারি মামলা, পুলিশের দেশত্যাগে বাঁধা- নানান জটিলতায় আগামীর দিনগুলো অন্ধকার হয়ে আসছে খালেকের জন্য। একাধিক মামলার আসামী হওয়ায় যে কোন সময় গ্রেফতার হতে পারেন। গুঞ্জন উঠছে, গ্রেফতার এড়াতে সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে পারেন। পালানোর আগেই তাকে আইনের আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে পুরো সেক্টরে অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন গোপালী আব্দুল খালেক। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির, সাবেক মেয়র খোকনসহ দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় থেকে দুই বীমা প্রতিষ্ঠানকে করেছেন ক্ষতিগ্রস্থ। লুটপাটের পাশাপাশি তার দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ ছিলেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ গ্রাহকরা। তুচ্ছ কারণে অকথ্য ভাষা থেকে নিস্তার পাননি কেউ। গালিগালাজ হতে শুরু করে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া কিংবা মামলার হুমকি, সব ওপেন সিক্রেট। বিষয়টি নিয়ে সবার মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করলেও সম্প্রতি তা প্রকাশ্যে এসেছে। তার বিরুদ্ধে এর আগে সোনার বাংলা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও সম্প্রতি কঠোর হয় ইসলামী ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ। দুই কোম্পানী থেকেই তাকে বিতাড়িত করা হয়। খালেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় শেখ কবিরের প্রভাব কাজে লাগাতেন। এখন সাবেক ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের নাম ভাঙ্গিয়ে চলছেন। এমনকি সিইও পদ টিকিয়ে রাখতে আইডিআরএর চেয়ারম্যান, বিআইএ ও ইন্স্যুরেন্স ফোরামের প্রভাবশালী নেতা তার আত্মীয়- এমন পরিচয় দিচ্ছেন। অপকর্ম জায়েজ করতে বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ হতে শুরু করে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করছেন। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এমনকি ছেলের নামও ব্যবহার করতে ছাড়েননি। ছেলে কানাডায় সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা- এমন পরিচয় দিয়ে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) হতে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশনেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

সোনার বাংলায় অনিয়ম ও আত্মসাৎ
অপরাধকে শৈল্পিকতায় রুপ দিয়েছেন আব্দুল খালেক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের ২২ বছর কর্মরত ছিলেন আব্দুল খালেক মিয়া। সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ৭ বছর। এছাড়াও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও লোকাল অফিসের ইনচার্জ ছিলেন। এই দীর্ঘ সময় নিজেকে করেছেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেন গত ১৮ বছরের আওয়ামী স্বৈরশাসন আমলে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় শেখ কবিরের প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির সম্রাট হয়ে উঠেন। একদিকে ধার্মিকতার মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা, আর অন্যদিকে গ্রুপিং, ক্ষমতার অবৈধ প্রভাব, ভয়ভীতি আর গালিগালাজ ছিল তার অন্ধকার জগৎ বিস্তারের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। বীমা কর্মী-কর্মকর্তা হতে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকদের সাথে প্রকাশ্যে অকথ্য ভাষায় মা-বাবা তুলে গালাগাল করতেন। এভাবে ভয় আর ত্রাসের রাজত্বের মাধ্যমে লুটপাটের দরবার খুলে বসেন। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেত না। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়া এই সিইও সোনার বাংলায় কোন নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করতেন না। একদিকে ভয় অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানে গ্রুপিং ও দ্বন্দ্ব তৈরি করে বীমা আইন লঙ্ঘন, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সোনার বাংলা থেকে হাতিয়ে নেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। একইসঙ্গে অতিরিক্ত কমিশন, বাকি ব্যবসা, ডামি নিয়োগ আর ভুয়া ক্লেইম সেটেলমেন্টের মাধ্যমে এই সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠানকে করেছেন প্রশ্নবিদ্ধ। লোকাল সার্ভিস অফিসের ইনচার্জ হতে শুরু করে সিইও- প্রতিটি কাজে অনিয়ম ও লুটপাট ছিল ওপেন সিক্রেট। ডকুমেন্ট টেম্পারিং, জালিয়াতি, অতিরিক্ত কমিশন এবং বাকি ব্যবসা করে ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও বাকি ব্যবসার বেশ কিছু টাকা- এখনো কোম্পানিতে জমা হয়নি।

সোনার বাংলার প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রম এবং অধঃপতনের নেপথ্য নায়ক আব্দুল খালেক মিয়া। আইন লঙ্ঘন করে ডামি নিয়োগ আর কমিশন বাণিজ্যের মূল হোতা হচ্ছেন তিনি। পঞ্চাশ শতাংশের বেশি কমিশন, ডকুমেন্ট জালিয়াতি ও নিয়মহীন ৮ থেকে ১০ জনকে উচ্চ বেতনে ডামি নিয়োগ দিয়ে তাদের বেতন ভাতা আত্মসাৎ করেন। বেপরোয়া খালেক দুর্নীতির মহোৎসবে লিপ্ত হন। কোম্পানির বিভিন্ন ডকুমেন্ট ম্যানুপুলেশন করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান শেখ কবিরের সুসম্পর্কের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে পরিচালনা পর্ষদ প্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো সময় দিতে না পারায় সুযোগ সদ্ব্যবহার করে- ভুয়া ক্লেইম পরিশোধের মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত হন।

ধীরে ধীরে অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় খালেকের ক্ষেত্রে। বেপরোয়া খালেক আইডিআরএর সিইও নিয়োগের শর্তাবলি ভঙ্গ করে সোনার বাংলায় দুইটি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। আর দু’টি গাড়ির সমস্ত খরচ কোম্পানি থেকে নিতেন। বেতনের বাইরে ও আপত্তিকর সুযোগ সুবিধা গ্রহন করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। পরিচালনা পর্ষদের অগাধ বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতিষ্ঠান জুড়ে একক আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গাড়ি-বাড়ি সবকিছু করেন। মাদারীপুর শীবপুর কুমেরপাড় গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান খালেক তৃতীয় বিভাগের শিক্ষা সনদ নিয়ে সোনার বাংলায় চাকরি করে বিপুল সম্পদের মালিক হন। ঢাকার গুলশানে ১০ কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট, শান্তিনগরে ফ্ল্যাট এবং কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি কিনেন। গ্রামের বাড়িতে ভাই-বোনদের বাড়ি করে দেয়ার পাশাপাশি তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ তৈরি করে দেন। এমনকি গ্রামের বাড়িতে মসজিদ, মাদরাসা ও পরিচালনা করতেন অবৈধ অর্থ দিয়েই। দুই ছেলেকে কানাডা পড়াশুনা করিয়েছেন। অথচ ছেলে কানাডায় সেনাবাহিনীতে চাকরি করছে, এমন মিথ্যাচার করে বর্তমান সময়ে প্রশাসনকে বিব্রত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে সোনার বাংলা সূত্র জানিয়েছে।

ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট কেলেঙ্কারি
সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের মাদার কোম্পানি সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স। খালেক সোনার বাংলা সিইও পদের পাশাপাশি সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের পরিচালক ছিলেন। অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের ৩ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেক ও তার স্ত্রী পারভীন আক্তারকে আইনি নোটিশ পাঠায় সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট। গত ২৫ জুন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ এস এম কবির খান পাঠানো নোটিশে ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসাৎকৃত অর্থ কোম্পানির হিসাবে জমার আল্টিমেটাম দেয়া হয়। অন্যথায় মামলা দায়েরসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

সোনার বাংলা সূত্র জানিয়েছে, খালেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দূনীর্তি ধরা পড়লে ২০২২ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সামাজিক কারণে কোম্পানি থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। তবে ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের টাকা নিয়ে আইনি নোটিশে বেঁধে দেয়া সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত জমা দেয়নি খালেক। তার বিরুদ্ধে দেওয়ানী ও ফৌজদারি আদালতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষ।

সাত অভিযোগে বিচার দাবি
সোনার বাংলার পর আব্দুল খালেক মিয়া অপর এক সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান ইসলামী ইন্স্যুরেন্স যোগদান করেন। সেখানে গিয়েও নানা বির্তকে জড়িয়ে পড়েন। সিইও অনুমোদনের আগেই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার কর্মকান্ডে ফুঁসে উঠে। আইডিআরএর কাছে সাত অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে চিঠি দেয় তারা। চিঠিতে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়-
১. আব্দুল খালেক মিয়া কথায় কথায় কর্মীদের ছাঁটাই করার হুমকি দিচ্ছেন। যা শ্রম, বিমা ও সরকারি আইনের পরিপন্থি। এতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অফিসের দৈনন্দিন কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে।
২. কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং কথায় কথায় খারাপ ভাষা প্রয়োগ করেন যা ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল।
৩. শ্রম, বিমা ও সরকারি আইন অমান্য করে সবার জন্য কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি করেছেন। সরকারি সার্কুলারে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস সময় নির্ধারিত থাকলেও তিনি কর্মঘণ্টা ১ ঘণ্টা বাড়িয়ে ৬টা পর্যন্ত করেছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, এটা মানসিক অত্যাচারের শামিল।
৪. কোম্পানি পরিচালনার জন্য সবধরনের আইন অমান্য করে অবৈধ কাজে উৎসাহ দেন।
৫. আব্দুল খালেক মিয়া ইসলামী ইনস্যুরেন্সে যোগদানের আগে আইডিআরএ’র নিয়ম অনুযায়ী কমিশন প্রদান করা হতো। কিন্তু তিনি যোগদানের পর তার ইচ্ছামতো কমিশন প্রদান করছেন। যা আইডিআরএ’র নিয়ম বহির্ভূত।

৬. তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স থেকে দুর্নীতির দায়ে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
৭. আব্দুল খালেক মিয়া সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে ১৬ কোটি টাকা বাকি ব্যবসা করেছেন। এরপর ইসলামী ইনস্যুরেন্সে যোগদান করে প্রায় ২ কোটি টাকা বাকি ব্যবসা করেছেন। যা আইডিআরএর নিয়ম-শৃঙ্খলার পরিপন্থি।

আইডিআরএ দেয়া সেই চিঠিতে, ‘এসব কর্মকান্ড বিবেচনা করে ইসলামী ইনস্যুরেন্স বাংলাদেশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তার হাত থেকে রক্ষা করে সিইও অনুমোদন না দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।’
কারণ দর্শানোর নোটিশ

সিইও হিসেবে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে প্রায় দু’বছর দায়িত্ব পালন করেন খালেক মিয়া। কিন্তু তার সময়টা ভালো কাটেনি। আর্থিক কেলেঙ্কারী ও স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়। একইসঙ্গে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে খালেক মিয়ার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ এনে জবাব দিতে বলা হয়।

২৫ আগস্ট লিখা এই চিঠিতে আব্দুল খালেকের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এতে বলা হয়- ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কোম্পানীর স্বার্থবিরোধী নানাকর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। তার এসব কর্মকান্ডে বেসরকারী সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠানটির অস্থিত্ব ও ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে। খালেকের র্বিতকিত কর্মকান্ড নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। বলা হয়, কোম্পানীতে যোগদানের পর থেকেই ব্যবস্থাপনায় খালেক মিয়ার অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতায় একাধিক শাখা বন্ধ হয়েছে এবং অনেক শাখা দীর্ঘদিন লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। তার রুক্ষ ও অমানবিক ব্যবহারে অতিষ্ট হয়ে বহু দক্ষ, অভিজ্ঞ ও যোগ্য শাখা প্রধান ও ডেস্ক কর্মকর্তা বাধ্য হয়ে কোম্পানী ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছেন। এমনকি নিম্নশ্রেণী থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা- প্রায় সবার ওপর তিনি ক্রমাগত চাকুরীচ্যুতির হুমকি দিয়ে অফিসে আতঙ্ক ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন- যা কর্মীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একইসঙ্গে খালেক মিয়া পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের মাধ্যমে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের অস্বাভাবিক সুবিধা দিয়েছেন, অন্যদিকে অনেক কর্মকর্তাকে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছেন।

এছাড়াও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে, প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে বিপুল অংকের প্রিমিয়ামের টাকা কোম্পানীর হিসাবে জমা না করেই ব্যবসা করেছেন। এমনকি, কোম্পানীকে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ করে অনুমোদন ও কাগজপত্র ছাড়াই অবৈধভাবে একাধিক বীমা ডকুমেন্ট বাতিল করেছেন- যা কোম্পানীর নীতিমালা ও আইন লঙ্ঘনের সামিল। এসব কর্মকান্ডে অপরিমিত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স- এমন দাবী করা হয় ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে।

এতে আরো বলা হয়, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স-এ আব্দুল খালেক এবং তার স্ত্রীর নামে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারীর অভিযোগ রয়েছে। এতে করে খালেকের নামের সঙ্গে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের নাম জড়িত থাকায় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে দাবী করা হয়। খালেক কান্ডে গ্রাহক ও জনগণের মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় কোম্পানীর অস্তিত্ব প্রতিনিয়ত সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলেও জানানো হয়।

এছাড়া ‘অনিয়ম ও অভিযোগ’ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা এই সিইও কোম্পানীর বিপুল অর্থ অপব্যয় করে মিডিয়ার লোকজনকে আপ্যায়ন ও উৎকোচ দিয়েছেন- কারণ দর্শানোর নোটিশে এ তথ্যও তুলে ধরা হয়। কোম্পানীর পরিচালকদের সঙ্গে অত্যন্ত অবমাননাকর, অসৌজন্যমূলক ও অশালীন আচরণ করেন আব্দুল খালেক।

‘অফিস চলাকালীন নানা রাজনৈতিক আলাপে জড়িয়ে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহতর’ অভিযোগও আনা হয় বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা এই সিইওর বিরুদ্ধে। এছাড়াও তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী ও অস্তিত্বের জন্যও মারাত্মক হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। একইসঙ্গে এসব কর্মকান্ডে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলেও চিঠিতে জানানো হয়। একইসঙ্গে এসব অভিযোগ নিয়ে মো. আব্দুল খালেক মিয়ার বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না-তার লিখিত জবাব দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়।

ইসলামী ইন্স্যুরেন্স থেকে অপসারণ

অবশেষে আর্থিক কেলেঙ্কারী ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স থেকে অপসারণ করা হয় বিতর্কিত সিইও আব্দুল খালেক মিয়াকে। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ২৪৮ তম সভায় তাকে চাকরি থেকে অবসানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০ আগস্ট ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত চিঠি আব্দুল খালেক মিয়াকে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘আপনার নিয়োগ চুক্তি পত্রের ১০ নং শর্তের আলোকে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ২৪৮ তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এতদ্বারা কোম্পানিতে আপনার চাকুরি অবসান করা হলো।’

তবে, তার বিতর্কিত কর্মকান্ড এবং শিক্ষা সনদ জটিলতা নিয়ে ইসলামী ইন্সুরেন্স এ সিইও অনুমোদন আটকে গিয়েছিল। তখন আইডিআরএর কিছু সুযোগ সন্ধানী কর্মকর্তার সহযোগীতায় সে যাত্রায় বেঁচে যান। এবারও তিনি বিপদে পড়লে আইডিআরএর সেই চক্রটি সক্রিয় হয়, খালেক বাঁচাতে তাদের তৎপরতা হঠাৎ বেড়ে গেছে। কারা কোন স্বার্থে তাকে বাঁচাতে তৎপর, খুঁজে বের করার দাবী জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ছাত্র হত্যা মামলার আসামি
বিতর্কিত বীমা কর্মকর্তা আব্দুল খালেক মিয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত একাধিক হত্যা মামলারও আসামি। আওয়ামী সরকারের সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করা খালেক কোনোভাবেই চাননি বিগত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হউক। তাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন ও অর্থ যোগান দেয়ার অভিযোগে আব্দুল খালেক মিয়ার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন ও অর্থ যোগানদাতা হিসেবে আরো দুটি অভিযোগ রয়েছে।

আব্দুল খালেক মিয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গাজীপুরে সংঘটিত হত্যাকান্ডের এক মামলার ৫৪ নং আসামি। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে দায়ের করা হত্যাকান্ডের দুটি অভিযোগের একটিতে ২৭ ও আরেকটিতে ৩৮ নং আসামি হিসেবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন করা হয়েছে।

গাজীপুরের গাছা থানায় শহীদ রায়হান আলীর বাবা মামুন সরদারের দায়ের করা মামলায় খালেকের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন ও প্রতিহত করতে হত্যাযজ্ঞ চালাতে অর্থায়ন ও সার্বিক সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, “আসামি স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার আমলে আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে সিন্ডিকেট বাণিজ্য, ব্যাংকের তহবিল আত্মসাত ও নানাভাবে অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থ-বিত্ত ও সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে এবং বিদেশে অর্থ পাচার করে। তারা অবৈধ সরকারের অবৈধ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য যখন যেভাবে প্রয়োজন সেভাবে অর্থ যোগান দিয়ে সর্বমহলে সরকারের অর্থ যোগানদাতা ও শেখ পরিবারের দুর্নীতির বিপুল পরিমাণের অর্থ পাচারে সহায়তাকারী হিসেবে পরিচিত। একইসঙ্গে আসামিগণ বিভিন্ন সময়ে গণভবন, সচিবালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ে দফায় দফায় বৈঠক করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য বল প্রয়োগ পূর্বক গণহত্যা করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।”

এছাড়া ২৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে দায়ের করা হত্যাকান্ডের একটি অভিযোগে ৩৮ নং আসামি হিসেবে আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ২০ জুলাই যাত্রাবাড়িতে ছাত্রজনতার ওপর সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে শহীদ সোহেলের স্ত্রী আয়শা আকতার কুহেলি বাদী হয়ে এই অভিযোগ দায়ের করেছেন।

গত ০৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে দায়ের করা হত্যাকান্ডের আরেকটি অভিযোগে ২৭ নং আসামি হিসেবে আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন করা হয়েছে। ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়িতে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আঃ রব মিয়া এই অভিযোগ দায়ের করেছেন।

দেশত্যাগ রোধে পুলিশের বাঁধা

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ক্ষমতা হারিয়ে কিছু দিন পালিয়ে বেড়ান খালেক। এরপর স্বপরিবারে দেশত্যাগের চেষ্টা করেন ফ্যাসিবাদের এই সহযোগী। কিন্তু হত্যা মামলার আসামী হওয়ায় বিমান বন্দরে আটকে দেয় ইমিগ্রেশন পুলিশ। হজ্জের নামে স্বপরিবারে সৌদি থেকে কানাডা পালানোর চেষ্টা ভেস্তে যায়।

এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত হত্যা মামলার আসামি খালেককের দেশ থেকে পলায়নের শঙ্কায় বিদেশ গমন রোধ চেয়ে চিঠি দেয় পুলিশ। চিঠিতে বলা হয়, ‘আসামি খালেক এখন পলাতক রয়েছেন এবং তিনি যে কোনো সময় দেশ ত্যাগ করে পালাতে পারেন।’

দরবেশ চ্যাপ্টার ক্লোজ
খালেক মিয়া আর বির্তক পাশাপাশি চলছে। সোনার বাংলা কেলেঙ্কারি, ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লুটে মামলা, ছাত্র হত্যার একাধিক মামলা, দেশত্যাগে বাধা ও ইসলামী ইন্স্যুরেন্স থেকে অপসারণ- সব মিলে বীমা খাত থেকে এই সিইওর চ্যাপ্টার ক্লোজ হতে চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খালেক অধ্যায় বীমা খাতের জন্য কলঙ্কের। আপাদমস্তক দুর্নীতিতে লিপ্ত ব্যক্তি বছরের পর বছর ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে লুটপাট করেছেন।

নাম প্রকাশে একাধিক সিইও বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মা-বাবা তুলে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ, এটা লজ্জার এবং ঘৃণার। শত অপরাধ করেও আইডিআরএর দুর্বল তদারকির কারণে এই লোক এতগুলো বছর বীমা খাতে টিকে আছে, এটা বিস্ময়কর! সময় এসেছে তার বিরুদ্ধে সবাই রুখে দাঁড়ানোর। এমন শাস্তি হওয়া দরকার যাতে কেউ অনিয়মের সঙ্গে জড়াতে শতবার চিন্তা করবে। তারা খালেকনামা তদন্তে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এ প্রসঙ্গে আইডিআরএর একাধিক কর্মকর্তা বলেন, খালেকের কর্মকান্ডের ব্যাপারে আমরা অবগত হয়েছি। অনেক অনিয়ম করেছেন তিনি। প্রভাবশালী কোম্পানীর কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে হয়তো কিছুটা পার পেয়ে গেছেন। এখন তার সকল কুর্কিতী প্রকাশ্যে এসেছে। সোনার বাংলার পর ইসলামী ইন্স্যুরেন্স থেকে বিতাড়িত হওয়ার মধ্যদিয়ে খালেক অধ্যায় শেষ হতে চলছে। তবে এক্ষেত্রে কিছু আইনগত প্রক্রিয়ার মানতে হবে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সকে। হত্যা মামলা কিংবা দেশত্যাগে বাঁধা- এসব আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী খতিয়ে দেখবে। আমরা শুধু আমাদের দায়িত্ব পালন করছি।

এ বিষয় জানতে খালেক মিয়াকে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।