জকসু নির্বাচনে কোন প্রার্থী কত ভোট পেলেন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ রচিত হলো। প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২১ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া প্রথম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’।

বুধবার দিবাগত রাত ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল ঘোষণা করেন।

ফলাফলের ব্যবচ্ছেদ ও একচেটিয়া আধিপত্য জকসুর কেন্দ্রীয় সংসদের মোট ২১টি পদের মধ্যে ১৬টিতেই জয় পেয়েছে ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল। অন্যদিকে, ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোট ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল মাত্র ৪টি পদে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী সদস্য পদে জয়ী হয়েছেন।

শীর্ষ তিন পদের ফলাফল সহসভাপতি (ভিপি) পদে ৫ হাজার ৫৫৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন রিয়াজুল ইসলাম। তিনি জবি ছাত্রশিবিরের বর্তমান সভাপতি এবং আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এ কে এম রাকিব পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৮৮ ভোট। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৫ হাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল আলীম আরিফ। তিনি জবি ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খাদিজাতুল কুবরা পেয়েছেন ২ হাজার ২৩ ভোট।

এ ছাড়া সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ৫ হাজার ২০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন মাসুদ রানা। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক আহবায়ক ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।

বিজয়ীদের প্রোফাইল ও আন্দোলনের চেতনার প্রতিফলন এবারের নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের অধিকাংশেরই জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক পদে বিজয়ী হয়েছেন মো. নুরনবী (৫,৪০০ ভোট)। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জবি শাখার প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে ৫ হাজার ৫২৪ ভোট পেয়ে বড় জয় পেয়েছেন ইব্রাহীম খলিল। আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে ৪ হাজার ৪০১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন নওশীন নাওয়ার। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য এবং আন্দোলনের সময় মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত মুখ ছিলেন। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ইনকিলাব মঞ্চের জবি শাখার আহবায়ক নুর মোহাম্মদ ৪ হাজার ৪৭০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।

এছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে সুখীমন খাতুন, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে হাবীব মোহাম্মদ ফারুক, ক্রীড়া সম্পাদক পদে জর্জিস আনোয়ার নাইম এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে মোস্তাফিজুর রহমান জয়ী হয়েছেন।

প্রতিপক্ষ জোট ও স্বতন্ত্রদের অবস্থান ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল থেকে তিনটি সম্পাদকীয় পদে জয় এসেছে। এর মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে তাকরিম মিয়া, পরিবহন সম্পাদক পদে শাখা ছাত্রদল নেতা মাহিদ হোসেন এবং পাঠাগার সম্পাদক পদে ছাত্রদল নেতা রিয়াসাল রাকিব বিজয়ী হয়েছেন।

কার্যনির্বাহী সদস্য পদে এই প্যানেল থেকে একমাত্র জয়ী হয়েছেন মোহাম্মদ সাদমান আমিন সাম্য। অন্যদিকে, ইংরেজি বিভাগের জাহিদ হাসান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সদস্য পদে জয়লাভ করে চমক দেখিয়েছেন।

নির্বাচনী জটিলতা ও ওএমআর বিতর্ক গত মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও ফলাফল ঘোষণা নিয়ে তৈরি হয়েছিল নাটকীয়তা। আধুনিক অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) যন্ত্রের মাধ্যমে ভোট গণনার সময় দুটি যন্ত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য আসায় গভীর রাতে গণনা স্থগিত করা হয়েছিল। প্রার্থীদের আপত্তির মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন প্রথম ২৭৮টি ব্যালট পেপার হাতে গণনা করে এবং পরে তা যন্ত্রে যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই কারিগরি জটিলতার কারণে ফলাফল প্রকাশে প্রায় ২৪ ঘণ্টা বিলম্ব হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটেছে এই নির্বাচনে।

ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও শিবিরের সাংগঠনিক ভিত্তি এবং সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্ক তাদের প্যানেলকে বড় জয় এনে দিয়েছে। বিজয়ী প্যানেলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখদের প্রাধান্য থাকায় সাধারণ ভোটারদের সমর্থন আদায় সহজ হয়েছে।

অন্যদিকে, ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদের সমন্বয়ে গঠিত জোটটি সাংগঠনিকভাবে শিবিরের একক প্যানেলের মোকাবিলা করতে হিমশিম খেয়েছে।

আগামীর প্রত্যাশা দীর্ঘ ২১ বছর পর জকসু কার্যকর হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। আবাসন সংকট সমাধান, পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান বৃদ্ধিতে নতুন এই সংসদ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে শিক্ষার্থীরা আশা করছেন।

নবনির্বাচিত ভিপি রিয়াজুল ইসলাম তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই জয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। জবিয়ানদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।

এসএইচ