শাহাদাত হোসেনঃ
ব্যাংক ও বন্ডের চেয়ে স্থাবর সম্পত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছে চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। আর তাদের এই অতি উৎসাহী কর্মকান্ড নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে খোদ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এজন্য আইডিআরএ থেকে কোম্পানিটিকে সর্তক করে দেয়া হলেও- এখনো থেমে নেই চার্টাড লাইফ।
চার্টাট লাইফের বিনিয়োগ করতে চাওয়া ওই সম্পত্তি রাজধানী কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহরে নয়; বরং কুমিল্লার মনোহরপুরে। মফস্বল এলাকায় এই বিনিয়োগে মুনাফার সম্ভাবনা নিয়ে আইডিআরএর পাশাপাশি অনেকেই সন্দিহান। আর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে চার্টাড লাইফের উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের মধ্যেও চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে অদৃশ্য কারণে কেউ মুখ খুলতে পারছে না।
কুমিল্লার মনোহরপুরে এ্কটি ফ্ল্যাট কিনতে চায় জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান চার্টাড লাইফ। এজন্য আইডিআরএ বরাবর একাধিক চিঠি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একদিকে জেলা শহর, অন্যদিকে ভবনটিও পুরাতন।
এই পুরনো ভবনের ফ্লাটে বিনিয়োগের তোড়জোড়ে কোম্পানির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাঁরা বলছেন, এখানে বড় কোন স্বার্থ জড়িত। এই ফ্ল্যাটের মালিকানায় চার্টার্ড লাইফের কোনো পরিচালক বা সিইও’র আত্মীয়-স্বজন কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠজনের কিনা- তা নিয়ে রয়েছে জোর গুঞ্জন। যার কারণে সারাদেশ কিংবা শহর রেখে একটি ‘নিদিষ্ট ভবনে পুরাতন’ ফ্ল্যাট কিনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে; চার্টাড।
সূত্র বলছে, ফ্ল্যাট ক্রয়ে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি করে চার্টাড লাইফ নিজেই। কোম্পানির চেয়ে তাদের নিয়োজিত সার্ভে প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ মূল্য অনেক বেশি। এছাড়াও একাধিক সার্ভে প্রতিষ্ঠানের ফ্ল্যাটের মূল্য ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায়- চার্টার্ড লাইফ ইন্সুরেন্সের বিনিয়োগ আবেদনের উদ্দেশ্যকে ঘিরে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে। তাই এই বিনিয়োগ প্রস্তাবনায় বড়সড় ‘কারসাজি’ রয়েছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইডিআরএতে দেয়া চাটার্ড লাইফ ইন্সুরেন্সের চিঠি থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাটার্ড লাইফ ইন্সুরেন্সের বিনিয়োগ তহবিল দাঁড়ায় ২০ কোটি টাকা। কোম্পানি এখান থেকে ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে ছয় হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনতে চায়। কুমিল্লার মনোহরপুরে হিলটন টাওয়ারের দশতলা ভবনে এই ফ্ল্যাট। ভবনটি নির্মিত ২০১৫ সালে। এই ফ্ল্যাট কিনতে চার্টার্ড লাইফ ইন্সুরেন্স ২০২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর আইডিআরএর অনুমোদনের জন্য আবেদন করে। কিন্তু এই বিনিয়োগ ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও সন্দেহজনক’ বিবেচনায় আইডিআরএ তা প্রত্যাখ্যান করে।
চার্টার্ড লাইফ ইন্সুরেন্স সূত্র থেকে জানা যায়, মনোহরপুরে অবস্থিত এই ভবনে ফ্ল্যাটের দাম যাচাই-বাছাইয়ে দুটি সার্ভেয়ার কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয় হয়। এরমধ্যে রয়েল ইন্সপেকশন লিমিটেড এই ফ্লোর স্পেসের প্রতি বর্গফুটের দাম প্রস্তাব করে চার হাজার টাকা। আরেক সার্ভেয়ার কোম্পানি মুনলাইট ইন্সপেকশন প্রতি বর্গফুটে দাম হাঁকিয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। অথচ চার্টার্ড লাইফ নিজেই দাম প্রস্তাব করেছে ৩ হাজার ৬ শত ৩০ টাকা। সার্ভে কোম্পানি এবং চার্টাড লাইফের ‘রেট’ এর ভিন্নতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইডিআরএ। ফ্ল্যাটের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে- এমনটি মনে করছে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, খোদ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের অনেক জায়গায় ৩ হাজার টাকায় বর্গফুটে ফ্ল্যাট বিক্রি হয়। রাজধানীর চেয়ে জেলা শহরে বেশি দামে ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ধারণ করায় চাটার্ড লাইফের এই বিনিয়োগ মূল্য- বেশি বলে মনে করছেন অনেকেই।
তাদের দাবী- চার্টার্ড লাইফ ইন্সুরেন্সের ফরমায়েসি সার্ভে কোম্পানি ও চার্টার্ড লাইফের প্রস্তাবিত মূল্যে আছে বড় ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি।
আইডিআরএর পর্যালোচনায় বলা হয়, ৬ হাজার ৪ শত ৭৪ বর্গফুটের ফ্লোর কিনতে ব্যয় হবে ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই মূল্যের সাথে নিবন্ধন ফি, পৌর কর ও অন্যান্য খরচসহ মোট বিনিয়োগ ২ কোটি ৯৪ লাখ ৬৫ হাজার ৬ শত ৬৮ টাকায় দাঁড়াবে। কেন চার্টার্ড লাইফ ইন্সুরেন্স এত বড় অংকের টাকায় কুমিল্লায় ফ্ল্যাট কিনতে চায়- তা আইডিআরএর কাছে স্পষ্ট নয়। এছাড়া এই ফ্ল্যাট বর্তমানে কি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বা কখনো ভাড়া হয়েছে কিনা অথবা ভাড়ার চাহিদা আছে কিনা- তাও আইডিআরএ জানে না। এই প্রকল্প ভবিষ্যতে লাভের মুখ দেখবে কিনা- তাও ইডরার ধারণার বাইরে।
এদিকে এই বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যাংকে বিনিয়োগ করলে ৮ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যাবে। সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ আরও লাভজনক। মূলধন হ্রাস পাবে না।
আইডিআরএর পর্যবেক্ষণে আরো দাবি করা হয়, চার্টার্ড লাইফ সম্ভাব্য মুনাফার স্বপক্ষে একটি সাফাই প্রতিবেদন দাখিল করে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানি ভাড়া বাবদ প্রতি বর্গফুট ৫০ টাকা বিবেচনায় নিয়ে ৬ হাজার ৪ শত ৭৪ বর্গফুট ফ্লোরের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। কোম্পানি কোন মানদণ্ডে ৫০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করেছে তাও আইডিআরএর কাছে বোধগম্য নয়। কুমিল্লার মতো একটি জেলা শহরে প্রতি বর্গফুটে ৫০ টাকা ভাড়া বেশি মনে হয়েছে। এই ভাড়া হতে পারে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। কোম্পানি প্রস্তাবিত বিনিয়োগ নীতিমালা আমলে নিয়ে ক্রয় মূল্য নিবন্ধন ফি পৌরকর ও অন্যান্য খরচসহ প্রায় দুই কোটি ৯৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হলে- সেখান থেকে ‘অবচয়’ বাবদ আরো খরচ বাদ যাবে। চার্টাড লাইফের তথ্য মতে, ভবনটি ২০১৫ সালে অর্থাৎ ১০ বছর আগে নির্মিত হয়েছে। সতর্কতা স্বরূপ আরো দশ বছর বাদ দিয়ে আয়ুস্কাল যদি ৮০ বছর ধরা হয় তাহলে বিনিয়োগের মুনাফা আরো কমে যাবে। কিন্তু চার্টার্ড লাইফের বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় ‘অবচয়’ আমলে নেওয়া হয়নি। তাছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে এই ফ্লোর বিক্রি করতে হলে ২ কোটি ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৬ শত টাকা পাওয়া যাবে বলে তাদের নিয়োজিত একটি সার্ভেয়ার কোম্পানি প্রতিবেদন দেয়। এতে মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা কোম্পানি ও বীমা গ্রাহকদের ক্ষতির মুখে ফেলবে।
চার্টার্ড লাইফ প্রদত্ত সার্বিক তথ্য বিবেচনায় আইডিআরএর কাছে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ ‘লাভজনক ও ঝুঁকিমুক্ত’ মনে হয়নি। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ চার্টাডের এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। কিন্তু আইডিআরএর এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে আবারও বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য চিঠি পাঠায় চার্টাড।
এ বিষয়ে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বীমা খাতে টাকা লুটপাটের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, জমি ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ। এসবের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের নোংরা চিত্র এখন ওপেন সিক্রেট। রাজধানী কিংবা বিভাগ রেখে কেন জেলা শহরে ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হলো চার্টাড লাইফ- বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ফ্ল্যাট ক্রয় নিয়ে চার্টাড লাইফের সিইও এস এম জিয়াউল হক বলেন, বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ফ্ল্যাট কিনতে হবে। এজন্য সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। যদিও আইডিআরএ ‘না’ বলেছে; তবুও আমরা আবার সম্ভাবনার দিক তুলে ধরে চিঠি দিয়েছি।
লাভজনক খাত রেখে কেন ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন- এমন প্রশ্ন করা হলে, বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এস এম জিয়াউল হক। বরং তিনি কোম্পানির নানান সুনাম তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইডিআরএর এক কর্মকর্তা বলেন, “সম্পত্তিতে বিনিয়োগে লুটপাটের আশঙ্কা থাকে। এখানে অতিরিক্ত দাম দেখানো হয়। অতীতে বিভিন্ন বীমা কোম্পানিতে আমাদের তদন্তে এই ধরনের জালিয়াতি, অনিয়ম-দুর্নীতি উন্মোচিত হয়েছে। এমনকি এসব সম্পদ যখন বিক্রি হয়েছে; দাম হওয়ায় তখনও কোম্পানি, গ্রাহক ও পলিসিহোল্ডাররা বেশিভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অসাধু চক্র ব্যক্তি স্বার্থে লাখো গ্রাহককে কোরবান করে দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “আবাসন খাতে বিনিয়োগে কোম্পানির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে একাধিকবার। ব্যবসা বৃদ্ধির চেয়ে তাঁরা সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়ে মনযোগী বেশি থাকে।”
এ সকল বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। অনেকের নামে মামলাও হয়েছে। একাধিক চেয়ারম্যান, পরিচালক, সিইও এবং সংশ্লিষ্টরা জেলেও গেছেন। তাই আমি মনে করি, বিনিয়োগকারী ও পলিসি হোল্ডারদের স্বার্থে চার্টার্ড লাইফের এই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা উচিত। এরপরও কেউ অতিউৎসাহী হলে- আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে আইডিআরএ। এসব নিয়ে কোন বীমা কোম্পানিকে অনৈতিক কর্মকান্ড বা সুবিধা গ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে না।”
প্রিয় পাঠক চার্টাড লাইফ ইন্সুরেন্স নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছি আমরা, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ থাকছে। আমাদের সঙ্গে থাকুন….











