বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া হুঁশিয়ারি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টাকার নোট নিয়ে ভিডিও কনটেন্ট

ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস কিংবা ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে জনপ্রিয়তা পাওয়ার নেশায় এখন অনেকেই আসল টাকার নোট বা নোটের আদলে তৈরি নমুনা নোট ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করছেন। তবে এই ধরণের কর্মকাণ্ড নিয়ে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সোমবার এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, টাকার নোট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বা কনটেন্ট তৈরি করা এবং বাণিজ্যিক প্রচারণায় আসল নোট সদৃশ কাগজ ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যারা এ ধরণের ভিডিও তৈরি করছেন কিংবা প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোতে এমন কিছু ভিডিও চিত্র ও ছবি দেখা যাচ্ছে যেখানে ব্যাংক নোটের অপব্যবহার হচ্ছে। ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে অনেকেই আসল নোটের ডিজাইন ও আকারের মতো, এমনকি কখনো আসল নোটের তুলনায় বড় আকারের নমুনা নোট ব্যবহার করছেন।

এতে সাধারণ মানুষ অনেক সময় ভিডিওতে দেখা এই নকল বা নমুনা নোটগুলোকে আসল ভেবে বিভ্রান্ত হতে পারেন। এ ধরণের উন্মুক্ত প্রচারণা বাজারে জাল নোটের প্রচলন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যা সামগ্রিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

টাকার নোট নিয়ে এ ধরণের শৌখিন বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড যে অপরাধ, তা মনে করিয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের প্রচলিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের উল্লেখ করেছে। ১৮৬০ সালের বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৮৯-৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি এমন কোনো নথি, কাগজ বা বস্তু প্রস্তুত, ব্যবহার বা বিতরণ করে যা বাজারে প্রচলিত ব্যাংক নোটের সদৃশ এবং যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম, তবে তা দণ্ডনীয় অপরাধ।

এই অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ও শাস্তির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা গুজবমূলক তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে আইনটি অত্যন্ত কঠোর। টাকার নোট নিয়ে ভিডিওর মাধ্যমে যদি কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়, তবে তা সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক লক্ষ্য করেছে, অনেক সময় বিভিন্ন শপিং মল, মেলা বা উন্মুক্ত স্থানে ব্যবসায়িক প্রচারণার জন্য আসল টাকার ডিজাইনের মতো হ্যান্ডবিল বা লিফলেট বিতরণ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এ ধরণের কর্মকাণ্ড মুদ্রা জালকারী চক্রের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। আসল নোটের রঙের বিন্যাস, জলছাপ বা নিরাপত্তা সুতা সদৃশ কোনো কিছু তৈরি করাও জালিয়াতির পর্যায়ভুক্ত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণ নাগরিকদের কোনো ভিডিও বা বিজ্ঞাপন দেখে প্রলুব্ধ হয়ে টাকার নোটের অপব্যবহার না করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোথাও জাল নোট বা নোট সদৃশ প্রচারপত্র দেখলে নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। ইউটিউবার বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, বিনোদনের জন্য মুদ্রার মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ভিডিও চিত্র প্রস্তুত করা থেকে বিরত থাকতে।

টাকা কেবল বিনিময়ের মাধ্যম নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। বিনোদনের ছলে বা ব্যবসার প্রয়োজনে এই প্রতীকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা কিংবা জালিয়াতির পথ প্রশস্ত করা যে কোনো নাগরিকের জন্য বড় ধরণের বিপদ ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সতর্কতা মূলত একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ, যা ডিজিটাল দুনিয়ায় দায়িত্বশীল আচরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।