এলপিজির দাম একলাফে ৩৮৭ টাকা বাড়ল , সিলিন্ডার প্রতি গুনতে হবে ১৭২৮ টাকা

ফাইল ছবি

পবিত্র রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতরের প্রস্তুতির মাঝেই সাধারণ মানুষের পকেটে বড় ধরনের টান দিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) নতুন মূল্যতালিকা। গত মাসের স্বস্তিকে বিষাদে পরিণত করে এপ্রিল মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় ৩৮৭ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন থেকে ভোক্তাদের একটি ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনতে ব্যয় করতে হবে ১ হাজার ৭২৮ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এই নতুন দর ঘোষণা করে। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকেই দেশজুড়ে এই নতুন দাম কার্যকর হবে।

বিইআরসি’র ঘোষণা অনুযায়ী, এপ্রিল মাসের এই দর বৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং পুরো মার্চ মাস সেই দামই বহাল ছিল। তবে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ৩৮৭ টাকার এই উল্লম্ফন সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অনেকটা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিইআরসি’র বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মার্চ মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ছিল ১,৩৪১ টাকা, যা এপ্রিল মাসে সমন্বয় করে ১,৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে করে এক মাসের ব্যবধানে সিলিন্ডারপ্রতি দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা। এই মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

একই সঙ্গে অটোগ্যাসের দামেও বৃদ্ধি আনা হয়েছে। নতুন নির্ধারিত দামে যানবাহনে ব্যবহৃত এই জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে। এতে করে যাত্রীভাড়া বৃদ্ধি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেবল রান্নার গ্যাসই নয়, গাড়িতে ব্যবহৃত জ্বালানি বা অটোগ্যাসের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। বিইআরসি জানিয়েছে, ভোক্তা পর্যায়ে অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটারে ১৭ টাকা ৯৪ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে মূসকসহ প্রতি লিটার অটোগ্যাসের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা। গত ২ মার্চ অটোগ্যাসের দাম সামান্য (৩ পয়সা) কমিয়ে ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা করা হয়েছিল, যা এখন প্রায় ৮০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেল।

যদিও বিইআরসি সাধারণত সৌদি আরামকোর সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) অনুযায়ী প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে থাকে, তবে এবারের ৩৮৭ টাকার ব্যবধান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়াকে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

যদিও সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এলপিজি আমদানিতে কিছুটা নমনীয় নীতি ঘোষণা করেছিল, কিন্তু তার ইতিবাচক প্রভাব খুচরা পর্যায়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

এলপিজির এই আকাশচুম্বী দামের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শহরের মেসবাড়ির শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত পরিবার এবং ছোট ছোট রেস্তোরাঁ মালিকরা। চুয়াডাঙ্গার তীব্র দাবদাহে যখন মানুষ অতিষ্ঠ, তখন জ্বালানির এই বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

রাজধানীর একজন গৃহিণী বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম এমনিতেই বাড়তি। তার ওপর যদি গ্যাসের দাম একবারে ৪০০ টাকার মতো বেড়ে যায়, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চলা অসম্ভব হয়ে পড়বে। মাসের হিসেবে আমাদের পুরো বাজেট এখন এলোমেলো হয়ে গেল।

বিইআরসি দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠ পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাওয়া নিয়ে সব সময়ই সংশয় থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও ১০০-২০০ টাকা বেশি আদায় করেন। এবারের বড় অংকের এই মূল্যবৃদ্ধির পর বাজার তদারকি আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি স্থানীয় প্রশাসন কঠোরভাবে মনিটরিং না করে, তবে খুচরা বাজারে সিলিন্ডার প্রতি দাম ২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অটোগ্যাসের দাম লিটার প্রতি প্রায় ১৮ টাকা বেড়ে যাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়বে যাতায়াত ভাড়ায়। অটোগ্যাস চালিত থ্রি-হুইলার ও প্রাইভেট কারগুলো তাদের ভাড়ার হার বাড়িয়ে দিতে পারে, যা সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়াবে।

জ্বালানি তেলের সংকট এবং বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের আশঙ্কার মাঝে এলপিজির এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। একদিকে চুয়াডাঙ্গার মতো জেলায় তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত, অন্যদিকে রান্নার জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের মাঝে ক্ষোভ দানা বাঁধছে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই না দিয়ে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে হলেও এই প্রয়োজনীয় সেবার দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার চেষ্টা করবে। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন সিদ্ধান্ত আগামী এক মাস বলবৎ থাকবে, যদি না এর মধ্যে বিশেষ কোনো নির্দেশনা আসে।