বাংলাদেশের রান্নার গ্যাসের বাজার এখন পুরোপুরি বেসরকারি খাতের কবজায়। এই অতিনির্ভরশীলতার কারণে সাধারণ ভোক্তারা বিইআরসি নির্ধারিত দামে গ্যাস পাচ্ছেন না এবং সংকটের সময়ে সরকারের হস্তক্ষেপ করার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে এলপিজির বাজারে ভারসাম্য ফেরাতে এবং গ্রাহকদের সস্তায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানিকারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত ১০ জানুয়ারি এই আমদানির অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠ পর্যায়ে সেই দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি রাখা হচ্ছে। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, এলপিজির পুরো বাজার বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় সংকটের সময় সরকার কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে না। বর্তমানে ডলার সংকট বা লজিস্টিক সমস্যার কারণে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সময়মতো আমদানি করতে পারছে না, যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর।
বিপিসি চেয়ারম্যানের মতে, যদি সরকার জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে এলপিজি আমদানি করে, তবে বাজারে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে এবং দামও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
বিপিসির চিঠিতে একটি বিশেষ প্রস্তাব রাখা হয়েছে যা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। যেহেতু এই মুহূর্তে বিপিসির নিজস্ব কোনো এলপিজি টার্মিনাল বা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের পরিকাঠামো নেই, তাই তারা বেসরকারি অপারেটরদের সুবিধা ব্যবহার করতে চায়।
বর্তমানে বেসরকারি আমদানিকারকরা কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র এলাকায় বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করে নিজেদের টার্মিনালে নিয়ে গিয়ে সংরক্ষণ ও বিতরণ করে। বিপিসিও একই পদ্ধতিতে বেসরকারি অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তাদের জেটি ও সংরক্ষণাগার ব্যবহার করে গ্যাস আমদানি ও বণ্টন করতে চায়। এ ক্ষেত্রে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে আলোচনা করে আমদানির পরিমাণ, মূল্য পরিশোধ পদ্ধতি ও বণ্টনের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, সরকার এখন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতিতে আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। তাঁর মতে, সরকারি পর্যায়ে আমদানি শুরু হলে বাজারে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলো ইচ্ছে করলেই গ্রাহকদের জিম্মি করতে পারবে না।
তবে উপদেষ্টা একটি বিষয়ে পরিষ্কার করেছেন—সরকার কেবল আমদানির দায়িত্ব নেবে। বোতলজাতকরণ বা সরাসরি ডোর-টু-ডোর বিতরণে বিপিসি এখনই জড়িত হবে না। এতে বেসরকারি কোম্পানিগুলো তাদের পরিকাঠামো ব্যবহারের জন্য সার্ভিস চার্জ পাবে এবং সরকারের গ্যাস সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
বিপিসির এই যুগান্তকারী পদক্ষেপকে বিশেষজ্ঞরা স্বাগত জানালেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, বিপিসি গ্যাস আমদানি করে যদি আবার সেই বেসরকারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই বাজারজাত করে, তবে দাম কমবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি আমদানিকৃত গ্যাস যদি বিপিসির তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি—পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের ডিলার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছানো না যায়, তবে বেসরকারি পর্যায়ে সেই একই ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’ দাম বাড়িয়ে রাখতে পারে। তাই শুধু আমদানি নয়, তদারকি ও সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণেও সরকারকে কঠোর হতে হবে।
বর্তমানে দেশে প্রতিবছর এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। এই চাহিদার ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়িতে এবং বাকি ২০ শতাংশ শিল্প ও যানবাহনে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি জোগান ছিল মাত্র ১৯ হাজার টন, যা মোট চাহিদার এক শতাংশেরও কম। অন্যদিকে বেসরকারি ২৩টি কোম্পানির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও বড় পরিসরে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র ৫-৬টি প্রতিষ্ঠান।
বিপিসির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩০ সালে এলপিজির চাহিদা বছরে ৩০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। এমতাবস্থায় এখনই সরকারি হস্তক্ষেপ না বাড়ালে জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বিপিসির এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, নানা জটিলতায় এলপিজি খাতে যে সংকট চলছে, বিপিসি আমদানিতে এগিয়ে এলে পরিস্থিতি ভালো হবে এবং সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ই উপকৃত হবেন।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি করার উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। এটি বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতের একাধিপত্য হ্রাস পাবে এবং বাজারে একটি স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি হবে। তবে চ্যালেঞ্জটি হলো—বেসরকারি পরিকাঠামো ব্যবহার করে সরকারি গ্যাস কতটুকু স্বচ্ছতার সাথে বাজারে আসবে, সেটি নিশ্চিত করা। যদি আমদানিকৃত সরকারি গ্যাস সরাসরি সাধারণ মানুষের নাগালে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবেই কেবল বিপিসির এই চিঠি ও পরিকল্পনা সফল হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের এই পদক্ষেপ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে কি না, তা সময়ের সাথেই পরিষ্কার হবে।
এসএইচ











