হোমল্যান্ড লাইফে শেয়ার জালিয়াতি: মৃত মানুষের শেয়ার খেকো হোমল্যান্ডের মফিজ

বছরের পর বছর অনিয়ম-দুর্নীতি, দখল পাল্টা দখল, শত শত কোটি টাকা লোপাট ও মামলা-হামলার প্রভাবে মৃত প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স। দিনের পর দিন প্রধান ফটকে তালা ঝুলতে থাকা জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানটির শেষ পরিণতি কোথায়, জানা নেই কারো। হাজার হাজার গ্রাহকদের বিমার অর্থ ফেরত যেমন অনিশ্চয়তায়- ঠিক তেমনি হোমল্যান্ডের ভবিৎষত নিয়ে তৈরী হয়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। তবে কেন এই সংকট? কারা ধ্বংসের দাড়প্রান্তে পৌছে দিয়েছেন সেই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। ‘হায় হায়’ কোম্পানি হোমল্যান্ডের অন্ধকার দিক নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে তুলে ধরা হলো- ‘যেভাবে মৃত মানুষের শেয়ার কেড়ে নিয়েছেন পরিচালক মফিজ উদ্দিন।’

হোমল্যান্ড লাইফের সব চেয়ে বড় স্ক্যাম হলো শেয়ার জালিয়াতি। অর্থ লোপাটের জন্য মৃত মানুষকেও ছাড় দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৭ সালে রাজধানীর মতিঝিল থানায় শেয়ার সার্টিফিকেট সংক্রান্ত একটি মামলা হয়। মামলায় অন্যতম আসামী হলেন কোম্পানীর তৎকালীন পরিচালক মো. মফিজ উদ্দিন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, কোম্পানীর শেয়ার নিয়ে ২০১২ সালে হুদা ভাসি চৌধুরী এন্ড কোং চাটার্ড একাউন্টস একটি অডিট করে। অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৫ থেকে ২০১২ সালে কোম্পানীর বোর্ড রুমের ভল্ট থেকে শেয়ার সার্টিফিকেট বই থেকে ১৩টি শেয়ার সার্টিফিকেটের পাতা চুরি হয়। পরবর্তীতে ২৯ এপ্রিল ২০১৪ সালে কোম্পানী থেকে মতিঝিল থানায় একটি সাধারন ডায়েরী করা হয়। পরবর্তীতে কোম্পানী সেক্রেটারী মো. আইয়ুব হাশেমী বাদী হয়ে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের তদন্তে কোম্পানীর অসৎ পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চুরি, প্রতারণা, স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং অর্থ আত্মসাতের ভয়ংকর দিক উঠে আসে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক গোলাম রব্বানী উল্লেখ করেন, পরিচালক মফিজ উদ্দিনের হোমল্যান্ড লাইফের শেয়ার বিক্রি/ট্রান্সফার ইস্যু ও পরিচালনা পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কাজী এনাম উদ্দিন আহমেদের স্বাক্ষর নিয়ে গরমিল সন্দেহ হয়। মূলত, আইন উপদেষ্টা এডভোকেট মোশারফ হোসেন সরদার প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করেন। এতে উঠে আসে, পরিচালক মফিজ হোমল্যান্ডের চেয়ারম্যান বরাবর শেয়ার সার্টিফিকেট ইস্যুর আবেদন করেন। অন্যদিকে, মফিজ উদ্দিন তার মালিকানাধীন হোমল্যান্ডের দশ হাজার মূল্যমানের শেয়ার সার্টিফিকেট খুজে পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগ করে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় একটি সাধারন ডায়েরী করেন। তাছাড়াও পত্রিকায় তার শেয়ার সার্টিফিকেট হারিয়েছে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।

অপরদিকে, মফিজ উদ্দিনের অনুকূলে ডুপ্লিকেট শেয়ার সার্টিফিকেট ইস্যু করা যায় কি-না, হোমল্যান্ড এর সাবেক কোম্পানী সচিব মোঃ আব্দুস সবুর খাঁন আইনগত মতামত চান। আইন উপদেষ্টা এডভোকেট মোশারফ হোসেন সরদার শেয়ার সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখেন, মেজর (অবঃ) টি.আই. এম নূরুন্নবী ট্রান্সফারী হিসাবে মফিজ উদ্দিন তার দশ হাজার শেয়ার ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানীতে বন্ধক রেখে প্রায় তিন কোটি টাকা ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন। এই ঋনের মেয়াদ শেষ হলে শেয়ার সার্টিফিকেট নিয়ে যান। তবে অফিস ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষ কাগজপত্রের ফটোকপি সংরক্ষণ করেন। মফিজের দেয়া শেয়ার সার্টিফিকেটের ফটোকপির সঙ্গে হোমল্যান্ডের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর মিল নেই। ফলে মফিজ উদ্দিনকে নতুন করে শেয়ার সার্টিফিকেট ইস্যুর সুযোগ নেই- এমন মতামত ব্যক্ত করেন আইন উপদেষ্টা। স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ এনে ৩৮০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪০৬/৪২০/১০৯ ধারায় মামলা হয়, সেখানে এক নাম্বার আসামী করা হয় মফিজ উদ্দিনকে।

সাক্ষর নিয়ে সন্দেহের কারণে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স থেকে মফিজ ও অন্যান্য পরিচালকদের শেয়ার সার্টিফিকেট ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জব্দ করে আদালতে পাঠান তদন্ত কর্তকর্তা। মামলার তদন্ত ও রহস্য উদঘাটনে জব্দ করা আলামত ও বিতর্কিত স্বাক্ষর সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরী হস্তলিপি শাখায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।

হোমল্যান্ডের চেয়ারম্যানের সাক্ষর মিল নেই- সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক ও হস্তলিপি বিশারদ হোসনে নূর আখতার ২০১৭ সালে এই মতামত ব্যক্ত করেন। এতে সাক্ষর জাল করার বিষয়টি উঠে আসে।

এছাড়াও মফিজ উদ্দিনের নামে শেয়ার ট্রান্সফারার মেজর (অবঃ) টি, আই.এম নূরুন্নবী জানান, ‘’দশ হাজার উদ্যোক্তা শেয়ার অপর পরিচালক কাজী এনাম উদ্দিনের কাজে বিক্রি করেন। তিনি মফিজ উদ্দিনের কাছে কোন শেয়ার বিক্রি করেন নি। তাছাড়া শেয়ার ট্রান্সফার সংক্রান্ত ফরম-১১৭ এ তিনি স্বাক্ষর করেন নি। এখানেও তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।’’

মামলার তদন্তে দেখা যায়, আসামী মফিজ উদ্দিন যে চারটি শেয়ার সার্টিফিকেট দিয়ে ন্যাশনাল হাউজিং এ বন্ধক রেখে ঋন নিয়েছেন, তা পুরোটাই জালিয়াতি। মূলত, মেজর নূরু নবীর শেয়ার কেনেন অপর পরিচালক কাজী এনাম উদ্দিন আহমেদ। এ বিষয়টি মফিজ উদ্দিন জানতেন। কিন্তু চেয়ারম্যান কাজী এনাম হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলে মফিজ শেয়ার সার্টিফিকেটের পাতা চুরি করে শেয়ার সার্টিফিকেট তৈরী করেন।

আসামী মফিজকে গ্রেফতারে ব্যাপক চেষ্টা করে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চুরি, জাল-জালিয়াতি, প্রতারনা ও বিশ্বাস ভঙ্গ করে টাকা আত্মসাৎতের ঘটনা বলে মনে করছে পুলিশ। কথিত পরিচালক মফিজ উদ্দিন তৎকালীন আইন কর্মকর্তার সহায়তার হোমল্যান্ড লাইফের ভোল্ট থেকে ১৩ টি শেয়ারের পাতা কৌশলে চুরি করেন। এরপর চারটি শেয়ারের পাতা জাল-জালিয়াতি করে শেয়ার সার্টিফিকেট তৈরি করেন। শেয়ারের অংক বসিয়ে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের বন্ধক রেখে ঋণ নিয়ে আর্থিক লাভবান হন। একইসঙ্গে মফিজ হোমল্যান্ডের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে প্রতারনার মাধ্যমে পরিচালক হয়ে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন। এছাড়া সিআইডি ফরেনসিক রির্পোটে মোঃ মফিজ উদ্দিন এর শেয়ার ট্রান্সফার ফরম (From-117) ছাড়াও সামিয়া কাজী আহম্মেদ, আম্বিয়া খাতুন, আব্দুল মুনিম, তজুম্মুল আলী, সুমাইয়া কাজী চৌধুরী ও মহি উদ্দিনদের শেয়ার ট্রান্সফার ফরম এর অনুমোদনকারী চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরও জাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হোমল্যান্ডের আলোচিত শেয়ার কেলেংকারীর মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

‘মৃত মানুষের স্বাক্ষর জালিয়াতির কঠোর  বিচার’ দাবী করে হোমল্যান্ড লাইফের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, মফিজ উদ্দিনের শেয়ার জালিয়াতি-অর্থ লোপাট নিয়ে ন্যাশনাল হাউজিংয়ের কর্মকর্তা শীতল চন্দ্র সাহা, মো. রবিউল হক, মো. মারুফুর রহমান এবং হোমল্যান্ডের সাবেক সিইও আজিজুল ইসলাম তালুকদার, সিএফও সফিকুল ইসলাম, কোম্পানী সেক্রেটারী মোয়াজ্জেম হোসেন, আবদুস সবুর, এমডি ওয়াহেদুল ইসলাম চৌধুরী, এরা সবাই জানেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা সম্ভব হলে মফিজের আরো অনেক অনিয়ম-দূর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসবে।

এ প্রসঙ্গে মামলার প্রধান আসামী হোমল্যান্ডের পরিচালক মো. মফিজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠো ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দেয়া হলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।