দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স: ১৯ লাখ টাকা বীমা দাবীতে ৫ লাখ ঘুষ দাবী!

শাহাদাত হোসেন:

দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ এনেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যবসায়ী। দীর্ঘ তিন বছর বীমা দাবীর টাকা না পেয়ে অবশেষে তিনি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম লিখিত অভিযোগে জানান, ২০২২ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে নোয়াখালীর চৌমুহনী মহেষগঞ্জ বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আলীপুর স্টোর’ সহ বাজারের আরও ১৮-১৯টি দোকান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়।

আইডিআরএতে অভিযোগে তিনি আরো বলেন, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের সাথে তাঁর ৫৫ লাখ টাকার অগ্নি বীমা চুক্তি ছিল। ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর বিষয়টি তিনি বীমা কোম্পানীকে জানান। পরবর্তিতে সংশ্লিষ্ট সার্ভে প্রতিষ্ঠান ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে ৪৮ লাখ টাকা। অথচ বীমা কোম্পানি দেশ জেনারেলের কর্মকর্তারা দাবি করেন, এই টাকা পেতে হলে তাকে অনেক ‘পের্পাস’ তৈরি করতে হবে এবং বীমা দাবী পেতে সময় লাগবে বহু বছর। তাঁকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ পেতে ১৯ লাখ ৮৫ হাজার ৩২৫ টাকায় সমঝোতা করে ‘লস ভাউচার’ সই করতে বলা হয়, যা তিনি করেনও। এরপর কোম্পানি ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে টাকা পরিশোধের আশ্বাস দিলেও আজ পর্যন্ত তিনি সেই বীমার টাকা পাননি।

এমনকি, অগ্নিকান্ডের কয়েকদিন পর নোয়াখালীর চৌমুহনীতে দেশ জেনারেলের স্থানীয় শাখা অফিসটিও সরিয়ে নেয়া হয়- যাতে গ্রাহকরা সরাসরি অভিযোগ করতে না পারেন।

এছাড়াও, সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি আসে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সর ক্লেইম কমিটির চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান তাকে সরাসরি ‘৫ লাখ টাকা ঘুষ’ দিতে বলেন। ঘুষ দিলে দ্রুত টাকা ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমিনুর রহমান বলেন, “তাহলে আইনি পথে যান।”

ব্যবসা হারানো মোঃ নুরুল ইসলাম লিখিত বক্তব্যে বলেন, এভাবে বছরের পর বছর হয়রানি, প্রতারণা ও ঘুষ দাবীর পাশাপাশি ভয়াবহ জালিয়াতির আশ্রয় নেয় দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটি ঘুষ নেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর নামে এক্সিম ব্যাংকের নামে ‘ভূয়া পেপার্স’ তৈরি করে জালিয়াতি করে। ব্যাংকে টাকা জমা না দিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেন করতে চায় তারা- যাতে ঘুষ নেয়ার সুযোগ থাকে। অথচ তিনি বা এক্সিম ব্যাংক কেউই এই বিষয়ে কোনো অনুমতি দেননি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, কোম্পানির সিইও মোহাম্মদী খানম, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম, অ্যাকাউন্টস অফিসার জিয়াউল হকসহ একাধিক কর্মকর্তা এতে জড়িত।

নুরুল ইসলাম বলেন, “আমি এখন সম্পূর্ণ হতাশ ও ক্লান্ত। একদিকে ব্যবসা হারিয়েছি, অন্যদিকে দীর্ঘ তিন বছর ধরে ঘুরেও ক্ষতিপূরণের টাকা পাইনি। অগ্নিকান্ডে ক্ষতির বিষয়টি দেশ জেনারেলের সাবেক চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনকে জানালেও কোন সহায়তা পাইনি। উল্টো ঘুষ, প্রতারণা ও জালিয়াতির শিকার হয়েছি। এখন আমি দেশ জেনারেলের অফিসে গেলে তারা বিরক্তবোধ করে, বলে- পরে আসেন। এমনকি আমার ছেলে মো. ওমর ফারুক এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করলে- তার সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করে। যার অডিও ক্লিপ সংরক্ষিত আছে- এমনটাই জানান ক্ষতিগ্রস্থ এই ব্যবসায়ী।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বরাবর দায়ের করা অভিযোগে, তিনি ন্যায্য ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি- বীমা খাতের প্রতারণা ও জালিয়াতি বন্ধ করতে এ বিষয়ে তদন্ত করে পরিচালক আমিনুর রহমান ও তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।

এ বিষয়ে দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের ক্লেইম কমিটির চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান ও সিইও মোহাম্মদী খানমের সঙ্গে  মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, ‘মিটিং এ আছেন’ বলে ফোন কেটে দেন। পরবর্তিতে তাঁরা কেউ ফোন রিসিভ করেন নি।

আইডিআরএর এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বীমা খাতে কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দূর্নীতি আর জালিয়াতির অভিযোগ পেলে তদন্ত করে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

  • ধারাবাহিক অনুসন্ধানী সংবাদের দ্বিতীয় পর্বে থাকছেএকের পর এক আইন লংঘন, কোন পথে দেশ জেনারেল?

এসএইচ