৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

বৈশ্বিক অর্থনীতির টানাপোড়েন আর অভ্যন্তরীণ নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ফের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড তাদের সাম্প্রতিক ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাবনা ২০২৬’ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪.৬ শতাংশ। যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা ইতিবাচক এবং আগামীতে আরও বড় অর্জনের সোপান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আঙ্কটাডের এই পূর্বাভাস এমন এক সময়ে এলো যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বেরিয়ে আগামী নভেম্বরে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে। সংস্থাটির মতে, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের এই প্রবৃদ্ধির হার আরও ত্বরান্বিত হয়ে ৫.৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

আঙ্কটাডের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি গত বছরের ৩.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে চলতি বছর ৪.৬ শতাংশ এবং আগামী বছর ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া এবং তানজানিয়ার মতো বড় অর্থনীতির স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অনুকূল পণ্যের বাজার এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি যেখানে ২০২৫ সালের ২.৮ শতাংশ থেকে কমে চলতি বছর ২.৭ শতাংশে নামার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

জাতিসংঘের এই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রাক মহামারি পর্যায়ের ৩.২ শতাংশের চেয়ে অনেক নিচে থাকবে। তবে গত বছর থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা গেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মূল্যস্ফীতি হ্রাস, ঋণ নীতি শিথিলকরণ এবং চাহিদা বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়েছে এবং বড় দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে চাহিদা বজায় রাখতে সহায়তা করছে। এ ছাড়া ভূ রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে।

আঙ্কটাডের এই পূর্বাভাসকে বাস্তবসম্মত মনে করলেও অর্থনীতিবিদরা এর পেছনে কিছু শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা বিআইআইএসএস এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর মনে করেন, প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকাংশেই নির্ভর করছে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ওপর। তার মতে, আঙ্কটাড ৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বললেও বিশ্বব্যাংক ৪.৮ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ ৪.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।

তবে এই সব পূর্বাভাসই কার্যকর হবে যদি নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করা জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য চলতি বছরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ অনুকূল আবহাওয়া ও সরকারি প্রণোদনার ফলে কৃষিতে বাম্পার ফলন প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতের বাইরেও বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়ছে এবং আগামী নভেম্বরে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হবে।

তবে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে উচ্চ খেলাপি ঋণ, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল দাম। এ ছাড়া বৈশ্বিক ভূ রাজনীতি এবং পরিবর্তনশীল বাণিজ্য নীতিও বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি বছর নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে ৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতারই প্রমাণ দেয়। তবে এই ধারা বজায় রাখতে হলে শুধু মেগা প্রকল্প নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে আরও দ্রুত ধাবিত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞ মহলের।

এসএইচ