বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী লড়াইকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকাতেও ফুটবল নিয়ে তৈরি হয়েছে ভিন্ন আবেগ। নিউ জার্সিতে আজ স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনালের আগে গাজার বহু ফিলিস্তিনি প্রকাশ্যে স্পেনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, কেবল ফুটবল নয়, ফিলিস্তিনের প্রতি স্পেনের রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থানই এই সমর্থনের প্রধান কারণ।
ফিলিস্তিনিদের কাছে স্পেনের প্রতি এই ইতিবাচক মনোভাবের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের মে মাসে স্পেন সরকারের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সে সময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছিলেন, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকটে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে এগিয়ে নেওয়া, গাজায় যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা, মানবিক সংকট মোকাবিলা করা এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা জোরদার করা।
শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, স্পেন জাতীয় দলের কয়েকজন খেলোয়াড় এবং কোচও গাজার মানুষের প্রতি প্রকাশ্যে সংহতি জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল এবং ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা। ফিলিস্তিনিদের মতে, এসব অবস্থান ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে মানবিক বার্তা হিসেবে গুরুত্ব বহন করে।
গাজার পঙ্গুদের ফুটবল দল ‘গাজা আল ইরাদা’ (গাজা ডিটারমিনেশন)-এর প্রধান কোচ হাতেম আল মাগরিবি বলেন, পুরো ফিলিস্তিনি জাতি চায় স্পেন বিশ্বকাপ জিতুক। তিনি বলেন, যেসব খেলোয়াড় যুদ্ধের কারণে হাত বা পা হারিয়েছেন, তারা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যারা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশের শক্তি হারাননি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ চলাকালে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য মিসরের কোচ হোসাম হাসানকেও ধন্যবাদ জানান তিনি।
তবে গাজায় ফুটবল দেখার পরিবেশ এখনও স্বাভাবিক নয়। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি হামলার কারণে বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানির অভাব এবং উচ্চমূল্যের কারণে অনেক মানুষ ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাবেক ফুটবলার ও স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপক আদনান আল আফিফি বলেন, বিদ্যুৎ থাকলেই কেবল মানুষ খেলা দেখতে পারে। কিন্তু জ্বালানির সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণে জেনারেটর চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের।
যুদ্ধের মধ্যেও ক্রীড়ার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হিসেবে গাজা সিটির প্যালেস্টাইন স্পোর্টস ক্লাবে বিশ্বকাপ উপলক্ষে দুটি প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছে। বর্তমানে এটিই গাজা উপত্যকার একমাত্র সচল ফুটবল ক্লাব, যেখানে খেলোয়াড়রা অনুশীলন ও ম্যাচ খেলতে পারেন।
বৃহস্পতিবার ও শনিবার সেখানে ফিলিস্তিন ও স্পেনের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দলের মধ্যে বিশ্বকাপের আদলে দুটি প্রদর্শনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ম্যাচে রেফারির পাশাপাশি প্রতীকী ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাও রাখা হয়, যাতে খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে পারেন।
৩৭ বছর বয়সী আদনান আল আফিফি বলেন, পুরো আয়োজন ছিল আবেগ, আনন্দ ও ইতিবাচক অনুভূতিতে ভরা। তার ভাষায়, স্পেন জাতীয় দলের প্রতি সমর্থন জানানোর এটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় প্রতীকী উদ্যোগ।
গাজার বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী আহমেদ আল বোজমও স্পেনের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা জানিয়ে বলেন, তিনি পুরোপুরি স্পেনের পক্ষেই আছেন, কারণ দেশটি ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে। গাজার অনেক মানুষের মধ্যেই একই ধরনের অনুভূতি কাজ করছে। তাদের মতে, স্প্যানিশ সরকারের অবস্থান এবং লামিনে ইয়ামালসহ কয়েকজন স্প্যানিশ ক্রীড়াবিদের প্রকাশ্য সংহতি তাদের হৃদয় ছুঁয়েছে।
অন্যদিকে, ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। টাইমস অব ইসরাইলের খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইলে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত রাব্বি শিমন অ্যাক্সেল ওয়ানিশের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ সমর্থনের কথা জানান।
বৈঠকে রাষ্ট্রদূত আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর পক্ষ থেকে নেতানিয়াহুর জন্য একটি বার্তা পৌঁছে দেন। জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘হাভিয়ের, আপনি একজন সত্যিকারের বন্ধু। আপনি আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমরা আর্জেন্টিনার পাশে আছি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাদের সমর্থন করি। আগামীকালের (রোববার) ম্যাচের জন্যও শুভকামনা রইল। শুভকামনা আর্জেন্টিনার জন্য।’
এম এস











