যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সুরক্ষিত অনুষ্ঠান ‘হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনার’-এ অতর্কিত হামলা চালিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এখন এক যুবক।
মার্কিন গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, এই হামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে ‘কোল টমাস অ্যালেনকে‘ক্যালিফোর্নিয়ার একটি শান্ত শহর থেকে এসে ওয়াশিংটনের অভিজাত বলয়ে এই তাণ্ডব চালানোর নেপথ্যে কে এই অ্যালেন? এখন পর্যন্ত তার সম্পর্কে যা জানা গেছে, তা একাধারে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক।
৩১ বছর বয়সী কোল টমাস অ্যালেন ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস শহরতলীর ‘টরেন্সের‘বাসিন্দা। তার জীবনবৃত্তান্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সে কোনো সাধারণ অপরাধী নয়, বরং যথেষ্ট মেধাবী একজন ব্যক্তি।
অ্যালেন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (Caltech)থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। ক্যালটেক থেকে পাস করা একজন শিক্ষার্থীর এমন সহিংস পথে পা বাড়ানো গোয়েন্দাদের রীতিমতো অবাক করেছে। স্নাতক শেষ করার পর সে নিজের শহর টরেন্সে একজন গৃহশিক্ষক (Tutor) হিসেবে কাজ করছিল। প্রতিবেশীদের কাছে সে অত্যন্ত শান্ত ও অন্তর্মুখী হিসেবে পরিচিত ছিল।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই হামলাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং ছিল সুপরিকল্পিত। পুলিশ জানিয়েছে, যে হোটেলে (ওয়াশিংটন হিলটন) এই ডিনার পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল, অ্যালেন সেখানে আগে থেকেই একজন ‘অতিথি (Guest)হিসেবে অবস্থান করছিল।
একজন সাধারণ অতিথির ছদ্মবেশে সে হোটেলের কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করতে সক্ষম হয়। তার কাছে কেবল একটি আগ্নেয়াস্ত্র নয়, বরং ‘একাধিক বন্দুক এবং ছুরি‘ছিল। ডিনারের উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে সে কীভাবে এত অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করল, তা এখন সিক্রেট সার্ভিসের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হামলার পরপরই সিক্রেট সার্ভিসের ত্বরিত পদক্ষেপে অ্যালেনকে ধরাশায়ী করা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যালেনকে আটক করার একটি ছবি শেয়ার করেছেন। ছবিতে দেখা যায়, অ্যালেনকে মাটিতে শুইয়ে তার হাত দুটি পিঠমোড়া করে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়েছে।
গুলি বিনিময়ের সময় বা আটকের প্রক্রিয়ায় অ্যালেন আহত হয়েছে এবং বর্তমানে সে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তবে তার আঘাত কতটা গুরুতর, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার তাকে আদালতে তোলা হবে এবং তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হবে।
ইতিমধ্যেই এফবিআই (FBI) ক্যালিফোর্নিয়ার টরেন্সে অ্যালেনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। তার কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং ব্যক্তিগত ডায়েরি জব্দ করা হয়েছে। সে কি একা এই হামলা চালিয়েছে নাকি এর পেছনে কোনো বড় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর প্ররোচনা ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিবিএস নিউজ (CBS News) জানিয়েছে, অ্যালেন কর্মকর্তাদের বলেছে যে তার লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর আঘাত হানা। একজন মেধাবী গৃহশিক্ষক থেকে সে কীভাবে একজন সশস্ত্র হামলাকারীতে পরিণত হলো, তার মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধানে নেমেছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোল টমাস অ্যালেনের মতো একজন উচ্চশিক্ষিত যুবকের এই চরমপন্থী হয়ে ওঠার ঘটনা মার্কিন সমাজের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার এক নতুন চিত্র তুলে ধরছে। কেন সে টরেন্স থেকে ৩০০০ মাইল পাড়ি দিয়ে ওয়াশিংটনে এসে এই হামলা চালাল? কেনই বা তার টার্গেট ছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মকর্তারা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে পুরো আমেরিকা।
আগামী সোমবার আদালতের শুনানিতে হয়তো এই রহস্যের অনেক জট খুলবে। তবে আপাতত কোল টমাস অ্যালেন নামটি মার্কিন নিরাপত্তার ইতিহাসে এক বড় ধরনের ব্যর্থতা ও উদ্বেগের প্রতীক হিসেবে খোদাই হয়ে রইল।











