বারবার হামলার শিকার ট্রাম্প, নিরাপত্তা নিয়ে ঘনীভূত শঙ্কা

জুলাই ২০২৪-এ এক ব্যর্থ হত্যাচেষ্টায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার সমাবেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে এত ঘনঘন নিরাপত্তাজনিত সংকট বা হামলার ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। গত রাতে ওয়াশিংটনে ‘হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনার’-এ গুলিচালনার ঘটনাটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জীবনে ঘটে যাওয়া একাধিক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের দীর্ঘ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন।

আজ একজন সাংবাদিক যখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন ‘কেন আপনি মনে করেন যে আপনার সাথেই বারবার এমনটা ঘটছে? তার উত্তরে ট্রাম্পের গলায় ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জিং সুর।

তিনি বলেন, যারা সবচেয়ে বড় প্রভাব তৈরি করে, তাদের পেছনেই মানুষ লাগে। যারা কিছু করে না, তাদের কেউ পিছু নেয় না।

ট্রাম্পের ওপর এই ধারাবাহিক হামলা ও হুমকির ঘটনাগুলো কেবল তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, বরং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দক্ষতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত কয়েক বছরের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে।

ট্রাম্পের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটেছিল ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পেনসিলভানিয়ার বুটলারে একটি নির্বাচনী জনসভায়। সেদিন মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার সময় হঠাৎ বন্দুকধারীর গুলিতে ট্রাম্পের ডান কান বিদ্ধ হয়। মুখ বেয়ে রক্তের ধারা নামলেও তিনি দমে যাননি।

সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা যখন তাঁকে মঞ্চ থেকে সরিয়ে নিচ্ছিলেন, তখন তিনি আকাশে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে গর্জে উঠেছিলেন ‘ফাইট! ফাইট! ফাইট! সেই হামলায় উপস্থিত জনতা থেকে একজন প্রাণ হারান এবং আততায়ী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।

বুটলারের ঘটনার মাত্র দুই মাস পরেই ট্রাম্প আবারও বিপদের সম্মুখীন হন। ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে ট্রাম্পের নিজস্ব গলফ ক্লাবে তিনি যখন খেলছিলেন, তখন ঝোপের আড়ালে এক সশস্ত্র ব্যক্তিকে ওত পেতে থাকতে দেখেন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা। দ্রুত ট্রাম্পকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে ট্রাম্প এক বার্তায় জানিয়েছিলেন, তিনি “নিরাপদ ও সুস্থ” আছেন। এই ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ফ্লোরিডার বাসভবন ‘মার-এ-লাগো’-তে এক সশস্ত্র ব্যক্তি অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। সুরক্ষিত সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়া সেই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে সে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। তবে সেই সময় ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থান করছিলেন, ফলে সরাসরি কোনো বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়নি।

গত রাতের ঘটনার পর পুলিশ এখনো হামলাকারীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে বিবিসির সহযোগী সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, আটককৃত বন্দুকধারী কোল টমাস অ্যালেন কর্মকর্তাদের বলেছে যে, তার লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে যুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালানো।

এই তথ্যটি অত্যন্ত উদ্বেগের, কারণ এটি নির্দেশ করে যে ট্রাম্পের বিরোধীরা এখন কেবল তাঁকেই নয়, বরং তাঁর পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে চাইছে।

কেন ট্রাম্পকে ঘিরে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্লেষকরা আমেরিকার বর্তমান মেরুকরণ হওয়া রাজনীতিকে দায়ী করছেন। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক এবং বিরোধীদের মধ্যকার চরম বিদ্বেষ এখন রাজপথ ছাড়িয়ে বন্দুকের নল পর্যন্ত পৌঁছেছে।

বিশেষ করে হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনারের মতো উচ্চ-নিরাপত্তা সম্পন্ন জায়গায় বন্দুকধারীর প্রবেশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এক বিশাল ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিক্রেট সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের কারণে বেঁচে গেলেও, এই হামলা প্রমাণ করে যে হামলাকারীরা এখন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প এই হামলাগুলোকে নিজের রাজনৈতিক সাহসিকতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি এক ‘অদম্য যোদ্ধা’, যাকে দমানোর জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। কিন্তু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে বারবার হামলার শিকার হওয়া একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসংকেত।

আগামী সোমবার কোল টমাস অ্যালেনকে আদালতে তোলা হবে। সেখানে হয়তো বেরিয়ে আসবে এই হামলার পেছনের মূল রহস্য। তবে আপাতত ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে ফ্লোরিডা সবখানে ট্রাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মীদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বারবার মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা এই নেতা এখন তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেন, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায়, এই হামলাগুলো তাঁর ‘প্রভাবশালী হওয়ার মূল্য।তবে মার্কিন জনগণের কাছে এটি এক অস্থির ও সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন।