কোরীয় গেমের নেশায় বহুতল থেকে লাফিয়ে ৩ বোনের আত্মহত্যা

ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে এক শিউরে ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে। কোরীয় গেম এবং দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতির প্রতি চরম আসক্তি কেড়ে নিল তিন কিশোরী বোনের প্রাণ।

মঙ্গলবার গভীর রাতে গাজিয়াবাদের ভারত সিটি আবাসন কমপ্লেক্সের নবম তলার বারান্দা থেকে একে একে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে তারা। মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া তাদের আট পৃষ্ঠার চিরকুট এবং ডায়েরি এখন এই রহস্যময় মৃত্যুর মূল সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিহত তিন বোনের নাম বিশিকা, প্রাচী ও পাখি। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গভীর রাতে বাবা, মা যখন ঘুমে, তখন তিন বোন তাদের শোবার ঘরের বারান্দায় গিয়ে ভেতর থেকে দরজা আটকে দেয়। এরপর নবম তলার জানালা দিয়ে একে একে নিচে ঝাঁপ দেয় তারা। মাটিতে আছড়ে পড়ার প্রচণ্ড শব্দ এবং চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে যায় নিরাপত্তারক্ষী ও প্রতিবেশীদের। বাবা, মা দরজা ভেঙে বারান্দায় পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে যায়।

ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ আট পাতার একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে। সেখানে একটি ডায়েরির কথা উল্লেখ করে তারা লিখেছে, দুঃখিত বাবা। এই ডায়েরিতে যা লেখা আছে সব পড়ে নিয়ো, কারণ এসবই সত্যি। নোটের এক কোণে হাতে আঁকা একটি কান্নার ইমোজি ছিল। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কোভিড ১৯ মহামারির সময় থেকেই এই তিন বোন একটি কোরিয়ান লাভ গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে। আসক্তি এতটাই তীব্র ছিল যে, গত দুই বছর ধরে তারা স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা নিজেদের ভারতীয় নাম বদলে কোরীয় নাম রেখেছিল এবং সারাক্ষণ কোরীয় সংস্কৃতি নিয়েই পড়ে থাকত।

নিহতদের বাবা চেতন কুমার জানান, তিন বোন গোসল থেকে খাওয়া সবই একসঙ্গে করত। সম্প্রতি মেয়েদের এই অস্বাভাবিক আসক্তি দেখে তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় কমিয়ে দিয়েছিলেন মা, বাবা। এটিই সম্ভবত তাদের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।

শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বাবা চেতন কুমার বলেন, ওরা বলত কোরিয়া আমাদের জীবন, কোরিয়া আমাদের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। তুমি যা ই বলো, আমরা এটা ছাড়তে পারব না। এমনটা যেন কোনো বাবা, মায়ের সাথে না ঘটে। সন্তানদের কখনোই গেম খেলতে দেবেন না।

গাজিয়াবাদের সহকারী পুলিশ কমিশনার অতুল কুমার সিং জানান, মেজো বোন প্রাচী মূলত বাকি দুই বোনকে নেতৃত্ব দিত। ধারণা করা হচ্ছে, আত্মহত্যার এই মরণখেলাতেও সে ই তাদের পরিচালিত করেছে। মেয়েদের শোবার ঘরের দেয়ালে আমি খুব একা এবং আমার হৃদয় ভেঙে গেছে, এরকম হতাশাজনক সব বাক্য লেখা পাওয়া গেছে।

সিনিয়র পুলিশ অফিসার নিমিশ প্যাটেল জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কোনো গেমের নাম এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে এটি স্পষ্ট যে তারা একটি কাল্পনিক কোরীয় জগতের মোহে আচ্ছন্ন ছিল।

গাজিয়াবাদ ট্র্যাজেডির বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, উত্তর প্রদেশের ভারত সিটি আবাসনে নিহত বিশিকা, প্রাচী ও পাখি নবম তলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করে। তাদের মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে কোরীয় গেম ও কে ড্রামা বা কোরীয় সংস্কৃতির প্রতি আসক্তিকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আট পৃষ্ঠার নোট ও একটি ডায়েরি থেকে তাদের মানসিক অবস্থার প্রমাণ মিলেছে। বাবা চেতন কুমারের দুই পক্ষের সন্তান ছিল তারা।

মহামারির সময় দীর্ঘ লকডাউন কিশোর, কিশোরীদের মানসিকভাবে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। এই তিন বোনও সেই অনলাইন আসক্তির শিকার। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করা এবং পরিবারের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ছিল তাদের এই পরিণতির আগাম সংকেত, যা সম্ভবত সময়মতো অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি। গাজিয়াবাদের এই ঘটনাটি আধুনিক যুগের বাবা, মায়ের জন্য এক সতর্কবার্তা। প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার এবং অনলাইন জগতের ফ্যান্টাসি কীভাবে বাস্তব জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং প্রাণ কেড়ে নেয়, বিশিকা ও প্রাচীদের মৃত্যু আবারও তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।